Showing posts with label SUNDARBAN. Show all posts
Showing posts with label SUNDARBAN. Show all posts

Saturday, June 11, 2022

The tale of Hamilton's and Beckon Bungalow - Gosaba, Sundarban.

 

Sir Daniel Mackinnon Hamilton
Sir Daniel Mackinnon Hamilton and his bungalows at Gosaba Sundarban

স্যর ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন, এক মহৎ জীবনের গল্প।

The history of Mackinnon Mackenzie & Co Ltd.

১৮৮০ সালে, মাত্র কুড়ি বছর বয়সে এক তরুণ স্কটল্যান্ড থেকে জাহাজে পাড়ি দিয়ে বম্বে (অধুনা মুম্বাই) বন্দরে এসে নামেন। নাম ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন। জন্ম ১৮৬০ সালের ৬ই ডিসেম্বর স্কটল্যান্ডের এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারে। অল্প বয়সেই ভারতবর্ষে আসা পারিবারিক ব্যাবসার হাল ধরার জন্য। যে সে ব্যবসা নয়। খোদ ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি কোম্পানীর অন্যতম শেয়ারহোল্ডার ছিল ড্যানিয়েলের পরিবার। পৃথিবীর বহু জায়গায় শিপিং এজেন্ট হিসেবে রমরমা ব্যবসা করত ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি।  ভারতে মুম্বাইয়ে অফিস ছাড়া ব্যবসা ছড়িয়ে ছিল কলকাতা, রেঙ্গুন, হংকং, সাংহাই, কোবে আর ইয়োকোহামাতে। সেই সময়ের দুটি বিখ্যাত শিপিং কোম্পানীর British India Steamship Company (BI) আর Peninsular and Oriental Steamship Company (P&O), শিপিং এজেন্ট ছিল ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি। ভারতবর্ষ থেকে লন্ডন যাত্রী এবং পণ্য পরিবহণের জন্য মূলতঃ এই দুটি কোম্পানীরই জাহাজ চলত। কলকাতা, শ্রীলঙ্কা এবং বম্বে থেকে P&O কোম্পানীর জাহাজ সুয়েজ আর কেপ হয়ে প্রতি ১৫ দিন অন্তর যেত লন্ডন। আর BI এর জাহাজ ভারত হয়ে মধ্যপ্রাচ্য, মরিশাস, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে নিয়মিত চলাচল করত। এই  দুটি জাহাজ কোম্পানীরই এজেন্সি হাতে থাকার জন্য এবং ব্যবসা প্রায় একচেটিয়া হওয়ার জন্য ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি যথেষ্ট ফুলেফেঁপে উঠেছিল।

ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি কোম্পানীর যাত্রা শুরু হয়েছিল এই শহর কলকাতায়। একটু পিছিয়ে গিয়ে এই কোম্পানীর ইতিহাসে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

উইলিয়াম ম্যাকিনন, এই ভদ্রলোক হলেন যাঁকে নিয়ে আমাদের গল্প শুরু হয়েছিল, সেই তরুণ ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটনের পূর্বপুরুষ। জন্ম ১৮২৩ সালের ১৩ই মার্চ, স্কটল্যান্ডের ক্যাম্পবেলটাউনে। তরুণ বয়সে গ্লাসগোতে এসে প্রথমে একটি রেশমের গুদামে তারপর পর্তুগীজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অফিসে কাজ নিয়েছিলেন। এখানে কাজ করতে করতেই তাঁর মাথায় চিন্তা আসে ভারতে এসে ভাগ্যান্বেষণের। সেসময় বৃটিশ উপনিবেশ ভারতে জাঁকিয়ে বসছে, ব্যবসার প্রচুর সুযোগসুবিধা নিত্যনতুন খুলছে। বহু ইংরেজ সেসময় ভারতে আসছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর কাজে অথবা নিজের মতো করে ব্যবসায়ে ভাগ্যান্বেষণে। উইলিয়ামও ঠিক করেন তিনি আসবেন ভারতে। অবশেষে ১৮৪৭ সালে উইলিয়াম ম্যাকিনন পা রাখেন কলকাতায়।

তাঁর স্কুলের এক পুরোনো বন্ধু রবার্ট ম্যাকেঞ্জি তখন কলকাতায়। ম্যাকেঞ্জি এসেছিলেন তাঁর বন্ধুর কলকাতা পদার্পণের বেশ কয়েক বছর আগেই, ১৮৩৬ সালে। উইলিয়াম যখন কলকাতায় পা রাখলেন ততদিনে তাঁর বন্ধু ব্যবসাতে বেশ জমিয়ে বসেছেন। কিছু আমদানি, রপ্তানি ব্যবসার সাথে উপকূলীয় এলাকাতে স্টীমার সার্ভিস আর India General Steam Navigation Co নামের একটি ছোট জাহাজ কোম্পানীর শিপিং এজেন্সি নেওয়া ছিল।

উইলিয়াম সাহেব কলকাতায় আসার পরই দুই বন্ধুতে মিলে তৈরী করেন ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি কোম্পানী,। ১৮৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কোম্পানীর নথিভুক্তি হয়। ব্যবসা শুরু হয় মালপত্র আর ডাক পরিবহণের জন্য ভারতবর্ষ আর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে জাহাজ চালানো দিয়ে।

এর কিছুদিন পর ১৮৫৬ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর তৈরী হয় Calcutta and Burma Steamship Navigation Company। এই কোম্পানীতে ম্যাকিননেরও বিনিয়োগ ছিল। তাঁরা কিছু পুরোনো জাহাজ কিনে চালাতে শুরু করেন। সেই সময় যেকোন শিপিং কম্পানীর জন্য ব্রিটিশ সরকারের থেকে  RMS (Royal Mail Steamship) স্বীকৃতি পাওয়া ছিল ব্যবসায়িক দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। সরকারী পণ্য ও ডাক পরিবহণের কন্ট্র্যাক্ট আর তদোপরি নূন্যতম নিশ্চিত আয়ের সংস্থান,, এই দুয়ের হাতছানি যে কোন শিপিং কম্পানীর কাছেই অপ্রতিরোধ্য ছিল এবং সেকালে এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে রীতিমতো কঠিন প্রতিযোগিতা চলত। ম্যাকিননের প্রচেষ্টায় Calcutta and Burma Steamship Navigation Company এই RMS তকমা পেয়ে নিয়মিত জাহাজ চালাতে শুরু করে।

এর পরের কাহিনী শুধু উত্থানের। এর মধ্যেই ২৮ শে অক্টোবর ১৮৬২ সালে Calcutta and Burma Steamship Navigation Company এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় British India Steamship Navigation Company (BI). BI তৈরী হওয়ার পর ব্যাবসা বাড়ানোর জন্য তারা তৎকালীন আর এক বিখ্যত ফরাসী শিপিং কম্পানী Messageries Imperiales সঙ্গে হাত মেলায় শ্রীলঙ্কা আর পন্ডিচেরী বন্দর থেকে পারস্পারিক বন্দোবস্তের ভিত্তিতে যাত্রী এবং মাল বহনের জন্য।

ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি কম্পানী BI এর একমাত্র শিপিং এজেন্ট হিসেবে কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করত। এছাড়া ১৮৭১ সাল থেকে P&O কোম্পানীর শিপিং এজেন্সির কন্ট্র্যাক্টও ছিল এদের হাতে। এরপর আরো বড় একটা সুযোগ আসে ১৯১৪ সালে যখন BI এর সংযুক্তি হয় P&O এর সঙ্গে। সেই সময়ের হিসেবে দেখা যাচ্ছে এই দুই কম্পানীর হাতে মিলিত ভাবে ২০১ টি জাহাজ আর 1,146,767 GRT (Gross Registered Tons) পরিবহণ ক্ষমতা ছিল। এই দুই কোম্পানীর মিলনের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জির আয়ও অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

Sir Daniel Mackinnon Hamilton - A magnanimous Life

এতো গেল কোম্পানীর ইতিহাস, এবার আমরা ফিরে আসি আমাদের আসল গল্পে যেটির কেন্দ্রীয় চরিত্র হচ্ছেন এই ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন। ১৮৮০ সালে বম্বেতে এসে ম্যাকিনন ম্যাকেঞ্জি কম্পানীতে যোগদানের বেশ কিছুকাল পর, বিংশ শতকের প্রথম ভাগে তিনি কলকাতার অফিসের কর্ণধার হয়ে আসেন। কর্মস্থল ছিল স্ট্র্যান্ড রোডে কম্পানীর কলকাতার সদর দপ্তরে।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। হ্যামিলটন সাহেব বিলিতি কম্পানীর সর্বোচ্চ পদাধীকারী হয়ে সেযুগের আর পাঁচজন উচ্চবিত্ত ইংরেজের মত বিলাস ব্যসনে আরামসে দিন কাটিয়ে দিতে পারতেন। আলিপুরের বাংলো, খিদমতগার, খানসামা, বেয়ারা, পরিবৃত হয়ে, সন্ধ্যায় উচ্চকোটির ক্লাবে গলফ খেলে, গ্রীষ্মের ছুটিতে সিমলা দার্জ্জিলিং ইত্যাদি করে শেষ বয়সে প্রভুত অর্থ নিয়ে দেশে ফিরে নিরুপদ্রবে অবসর জীবন কাটানোটাই তাঁর পক্ষে দস্তুর ছিল। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ অন্যরকম হন, বাঁধাধরা পথে তাঁরা হাঁটেন না। নিষ্কন্টক আত্মকেন্দ্রীক জীবনের হাতছানি এড়িয়ে এঁরা অজানায় ঝাঁপ দেন। বৃহত্তর স্বার্থে  মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য তাড়না তাঁদের মধ্যে চলতে থাকে। ইতিহাসের পট পরিবর্তনে এই মানুষগুলোই হন অনুঘটক। ড্যানিয়েল হ্যামিলটন ছিলেন এমনই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।

সালটা হল ১৯০৩। হ্যামিলটন সাহেব সুন্দরবনের অধুনা গোসাবা ব্লকে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একলপ্তে ৯০০০ একর জমি কিনে নিলেন। এর মধ্যে গোসাবা ছাড়াও, রাঙাবেলিয়া, সাতজেলিয়া প্রভৃতি দ্বীপগুলিও ছিল। সেই সময় সুন্দরবনের ওইসব এলাকাগুলি দুর্গম আর বিপদ সংকুল, আক্ষরিক অর্থেই জলে কুমীর আর ডাঙায় বাঘ। তার ওপর ছিল জলদস্যুদের উপদ্রব।  নোনা জলের বানে প্রতিবছর ভেসে যেত পুরো এলাকা, চাষবাস তো দূরঅস্ত, মনুষ্য বসতির জন্য সম্পূর্ণ প্রতিকুল পরিবেশ। সেই সময় তিনি নিজেই একটি জার্নালে লিখেছিলেন,

In the Sunderbans of Bengal is a block of land which is now the home of the tiger and the deer, the wild boar and the crocodile. Two or three hundred years ago, I am told, it was the home of men, and I understand that the remains of old buildings and roads may still be seen. I am applying to the Government of Bengal for that land on which with the help of the bhadralok, the rayat and the Government of India, I shall create a zamindary of 30,000 biggahs or 10,000 acres, and hand it over to the Government of Bengal free of cost.” 


সেই মত কর্মকান্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল। হ্যামিলটন সাহেব কলকাতা থেকে লোকলস্কর নিয়ে গিয়ে কাজ শুরু করে দিলেন। জঙ্গল কেটে চাষের জমি তৈরী করা, মাটির উঁচু বাঁধ তৈরী করে নোনাজলের বন্যা থেকে সেই জমিকে রক্ষা করার কাজ পুরোদমে শুরু হয়ে গেল। হ্যামিলটন সাহেব এই এলাকায় থেকে নিজেই পুরো কাজের দেখভাল করতেন।

পুরো জমি চাষযোগ্য হলে তিনি এলাকাটিকে প্রায় ২৩৬ টি লটে ভাগ করে জনসাধারণকে লিজ দেওয়া শুরু করেন চাষ আবাদের জন্য। লোকবসতি তৈরী করার জন্য বাংলা ছাড়াও প্রতিবেশী উড়িষ্যা এবং বিহার থেকেও লোক এনেছিলেন হ্যামিলটন সাহেব। সরাসরি চুক্তি করা হয় উৎসাহী চাষীদের সঙ্গে। প্রত্যেককে ২৫ বিঘা করে এবং তার স্ত্রীর নামে আরো ২০ বিঘা, মানে পরিবারপিছু মোট ৪৫ বিঘা করে জমি লীজ দেওয়া হয়। চাষ আবাদ শুরু হলে মনুষ্যবসতি শুরু হবে আর ফসল বেচে জমির লিজ হোল্ডাররা ক্রমশঃ স্বনির্ভর হয়ে উঠবে এই ছিল মূল লক্ষ্য। এপর্যন্ত ঠিক আছে, ব্রিটিশ ভারতে জমিদারী প্রথা কিছু নতুন ছিল না। তফাৎ হল আদতে জমিদারি মডেল হলেও সেটিকে একটি আদর্শ ওয়েলফেয়ার এস্টেট হিসেবে গড়ে তোলা ছিল হ্যামিলটনের স্বপ্ন। কো-অপারেটিভ মুভমেন্ট বলতে আমরা যা বুঝি সেটা হ্যামিলটন সাহেব বিংশ শতকের শুরুতেই দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই গোসাবায় ১৫ জন সদস্য নিয়ে তৈরী হয় ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটি। সোসাইটির প্রথম মূলধন ৫০০ টাকা, হ্যমিলটন সাহেব নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন। এটি ছিল প্রধান সংস্থা, এবং এর পর এটিকে ভিত্তি করে আরো ছোট ছোট সেলফ হেল্প গ্রূপ তৈরী করে ক্ষুদ্র ঋণের সুবিধা যাতে সকলে পেতে পারে তার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। সে সময় ব্যাঙ্কিং সুবিধা গ্রামাঞ্চলে ছিল না, গোসাবার মত জায়গাতে তো নয়ই। তখন গ্রামে গ্রামে মহাজনদের রমরমা। জমি বাড়ি বন্ধক রেখে অস্বাভাবিক হারের সুদে টাকা ধার নিয়ে মানুষ আজীবনের মতো এদের জালে জড়িয়ে পড়ত। আসল তো দুরের কথা, সুদের টাকাও শোধ করা খাতকদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ত। এরপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত যদি কোন বছর খরা, অতিবৃষ্টি বা বন্যার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিত, তাহলে  সব হারিয়ে এরা ক্রীতদাসে পরিণত হত। এই ভয়ংকর মহাজনদের সম্মন্ধে হ্যামিলটন সাহেব ভালোই অবগত ছিলেন। তিনি বলতেন মহাজনরা হল আদতে Hookworms এর মতো। এই মহাজনদের এবং আড়কাঠিদের  হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যই কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি তৈরি আর তার প্রসারে প্রচুর অর্থ এবং সময় ব্যয় করেছিলেন তিনি।

এরপর গোসাবায় তাঁর কর্মকান্ড তরতর করে এগিয়ে চলে। উন্নয়নের তালিকা যথেষ্ট দীর্ঘ। ১৯১৮ সালে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বন্টনের জন্য তৈরী হয় Consumers' Cooperative Society, এছাড়া ১৯১৯ সালে একটি মডেল ফার্ম তৈরী করা হয় যেখানে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধান, সবজি, বিভিন্ন স্থানীয় ফল্মুল ইত্যাদি চাষের পদ্ধতি আর ফলন বাড়ানোর উপায় নিয়ে কাজ চলত। এলাকায় উৎপন্ন ধানের সুষ্ঠ বিক্রি আর উৎপাদনকারীরা যাতে ন্যায্য দাম পান সেজন্য ১৯২৩ সালে তৈরী হয়  Paddy Sales Society। এলাকার সমস্ত উৎপন্ন ধান জমা করা হত একটি কেন্দ্রীয় গোলায়। সেখান থেকে উপযুক্ত সময় বুঝে খোলা বাজারে ধান বিক্রি করা হত যাতে দাম ভালো পাওয়া যায় আর সরাসরি সেই লাভের শরিক হত সমস্ত কৃষকরা।   তার পরের বছর আত্মপ্রকাশ করে গোসাবা সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক। এলাকার কমবেশি ১৯টি ক্রেডিট সোসাইটির ঋণের প্রয়োজন মেটাতো এই ব্যাঙ্ক।

যামিনী রাইস মিল তৈরী হয় ১৯২৭ সালে। এলাকায়্ উৎপন্ন ধান থেকে চাল যাতে স্বয়মনির্ভর ভাবে এলাকাতেই তৈরী করা যায় সেই উদ্দেশ্যে। ১৯৩৪ সালে সুসংহত গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের রূপরেখা তৈরী এবং তা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠে Rural Reconstruction Institute। তার দুবছর পরে গোসাবাতে হ্যামিলটন সাহেব চালু হয় বিনিময়ের জন্য নিজস্ব এক টাকার নোট। এতে ছাপা থাকত এই লাইনটি “Sir Daniel Mackinnon Hamilton promises to pay the Bearer, on demand, at the Co-operative Bhundar, in exchange for value received, One Rupee’s Worth of rice, cloth, oil or other goods (sic).” (নিচের ছবি দ্রষ্টব্য)

Currency_Started_By_Daniel_Makinnon_Hamilton


এই কর্মকান্ড চলাকালীন হ্যামিলটন সাহেবের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এই কর্মকান্ড নিয়ে তাঁর বহু পত্র বিনিময় হয়েছে। হ্যামিলটনের হাতে  সুন্দরবনের গোসাবা যে সময় গড়ে উঠছে রবীন্দ্রনাথও সেই সময়ে বীরভূমে পল্লী উন্নয়ন এবং আশ্রমিক শিক্ষার আদর্শ নিয়ে গড়ে তুলছেন শান্তিনিকেতনকে। ফলতঃ দুজনারই আগ্রহ ছিল পরস্পরের মতাদর্শ এবং কাজের প্রতি। সরকারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ ভরসা ছিলনা তার প্রমাণ পাওয়া যায় হ্যামিলটনকে লেখা কবিগুরুর চিঠির এই লাইনটা। তিনি লিখলেন,

‘I have not much faith in politicians when the problem is vast needing a complete vision of the future of a country like India entangled in difficulties that are enormous. These specialists have the habit of isolating politics from the large context of national life and the psychology of the people and of the period. They put all their emphasis upon law and order, something which is external and superficial and ignore the vital needs of the spirit of the nation…


গোসাবা প্রোজেক্টের সব কাজ শেষ হতে হতে প্রায় ১৯৩০ সাল হয়ে গিয়েছিল। ১৯০৪ সালে শুরু করে একটু একটু করে তাঁর স্বপ্নকে গড়ে তোলেন ড্যানিয়েল হ্যামিলটন। অবশেষে ১৯৩০ সালে তিনি কবিগুরু এবং মহাত্মা গান্ধী দুজনকেই গোসাবাতে আমন্ত্রণ জানান তাঁর কর্মকান্ডকে স্বচক্ষে দেখার জন্য।

গান্ধীজী নিজে আসতে পারেননি, কিন্তু তাঁর ব্যাক্তিগত সহায়ক মহাদেব দেশাইকে পাঠিয়েছিলেন গোসাবায়। দেশাই গোসাবায় এসেছিলেন ১৯৩৫ সালে। সাতদিন এখানে থেকে, নিজের চোখে সব কিছু দেখে ফিরে গিয়ে তিনি সাপ্তাহিক 'হরিজন' পত্রিকায় চার খন্ডের রিপোর্ট দিয়েছিলেন। সেই ব্যাপারে আবার ফিরে আসছি।

Rabindranath Tagore's visit at Gosaba and stay at Beckon Bungalow


রবীন্দ্রনাথের পদধুলিতে ধন্য হয়েছিল গোসাবার মাটি।  ১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে কবিগুরু ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের আতিথ্য গ্রহণ করেন। সে বছরের শেষ দুটি দিন ৩০ এবং ৩১শে ডিসেম্বর অশীতিপর রবীন্দ্রনাথ কাটিয়েছিলেন বেকন বাংলোতে। একাত্তর বছর বয়সেও কবিগুরু ছুটে গিয়েছিলেন নতুন কিছু শেখার তাগিদে। গোসাবায় কবিগুরুর দুদিনের আবাস সেই কাঠের তৈরী বেকন বাংলো এখন পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।

আগেই বলেছি গান্ধীজীর সচিব মহাদেব দেশাই এসেছিলেন ১৯৩৫ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী। তিনি পুরো কর্মকান্ড এক সপ্তাহ ধরে গভীর উৎসাহের সঙ্গে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর নিজের লেখা রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায় ড্যানিয়েল হ্যামিলটন এবং তাঁর কর্মকান্ড সম্মন্ধে তিনি কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর নিজের জবানীতে হ্যামিলটন সাহেবের সম্পর্কে লিখেছেন,

"A man of lofty idealism, everything he has done has had some noble conception at its back"


এছাড়াও তাঁর জবানী থেকে বিশেষ কিছু অংশ তুলে দিলাম। গোসাবা প্রোজেক্টের বেশ কিছু দিক তাঁকে বিস্মিত আর মুগ্ধ করেছিল, তারই প্রকাশ নিচের ছত্রগুলিতে।

What is remarkable is the fact that in a population of 10,000 there has been no case, criminal or civil, that has ever gone to the law courts. As I examined the records, I came across the proceedings – elaborate enough – of an intricate partition case that the Panchayats had tried and decided to the satisfaction of the parties. No wonder a Calcutta Barrister said that the Panchayats in Gosaba administered justice more expeditiously and with more fairness and equity than law courts and without any expense whatsoever.


সত্যই সে সময় গোসাবায় মানুষের মধ্যে বিবাদ বিস্মবাদ প্রায় ছিলই না এবং থাকলেও তা নিজেদের মধ্যে আলোচনার সাপেক্ষেই নিষ্পত্তি হত। থানা, পুলিশ, কোর্ট, কাছারী এসবের প্রয়োজন পড়ত না। 

নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোস্যাইটির কর্মকান্ড মহাদেব দেশাই খুব কাছ থেকে খতিয়ে দেখেছিলেন, কথা বলেছিলেন সদস্যদের সঙ্গে, পরীক্ষা করে দেখেছিলেন ঋণদান এবং ঋণশোধ সম্পর্কিত যাবতীয় কাগজপত্র।  তাঁর সেই অভিজ্ঞতা ওনার নিজের লেখা থেকেই তুলে দিলাম।

I visited several villages on the Estate and talked to people, questioning and cross questioning them in detail, and examined their records also. I found that not only were the loans being repaid fairly regularly, but that they were being appropriated for the purpose for which they were borrowed. I examined the records of the village Panchayats and was agreeably surprised at the orderliness, precision and cleanliness with which they were kept.


এই ছিলেন ড্যানিয়েল হ্যামিলটন। যে গোসাবা জল, জঙ্গলপূর্ণ মানুষের অগম্য বাদাবনের অংশ ব্যতীত কিছুই ছিল না, কর্মকান্ড শুরু হওয়ার ৩০ বছরের মধ্যে গোসাবা প্রায় ১০,০০০ বাসিন্দার এক সমৃদ্ধ এবং স্বয়ংসম্পুর্ণ জনপদ হয়ে গড়ে উঠেছিল। গোসাবার কর্মকান্ডে বরাবরিই ওতঃপ্রত ভাবে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। প্রতি বছর শীতকালে নিয়ম করে তিনি গোসাবায় এসে থাকতেন। তাঁর স্মৃতি বিজড়িত সেগুন কাঠের বাংলোটি আজও গোসাবায় দাঁড়িতে আছে। শেষ জীবনে হ্যামিলটন সাহেব স্কটল্যান্ডে তাঁর দেশে ফিরে যান। দেশে ফেরার অনতিকাল পরেই ১৯৩৯ সালের ৬ই ডিসেম্বর (যে তারিখ তাঁর জন্মদিনও বটে) তাঁর দেহান্ত হয়। যেসব বিদেশী ভারতবর্ষে এসে এই দেশটিকে আপন করে নিয়ে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন সেই তালিকায় স্যার ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন অবশ্যই ওপর দিকে থাকবেন আর  শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর নাম চিরকাল স্মরণ করা হবে।

গোসাবা মডেল যে কতটা শক্ত ভিতের উপর তৈরী হয়েছিল তার অগ্নিপরীক্ষা হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৈন্যদের জন্য খাদ্য আর রসদ মজুতের দোহাই দিয়ে চার্চিলের ব্রিটিশ সরকারের ইচ্ছাকৃত  জনবিরোধী নীতির কারণে বাংলার বুকে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, ইতিহাসের পাতায় যেটা তেতাল্লিশের মন্বন্তর নামে কুখ্যাত। এই  মন্বন্তরে অবিভিক্ত বাংলায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় অনাহারে, অপুষ্টিতে আর রোগে ভুগে। এই দুঃসময়েও গোসাবা অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের খুব একটা প্রভাব পড়েনি। কো-অপারাটিভ সোস্যাইটির দৌলতে যথেষ্ট খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। কো-অপারেটিভ সোসাইটির ইন্সপেক্টরের রিপোর্টে দেখা যায় সেই মন্বন্তরের বছরেও হ্যামিলটনের সোসাইটি লাভের মুখ দেখেছে।

উন্নতির শিখর ছোঁয়ার পরের কাহিনী শুধুই পতনের। কিভাবে তিল তিল করে গড়ে তোলা এক স্বপ্নের অপমৃত্যু হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ গোসাবা। স্যর ড্যানিয়েলের ভারত ত্যাগ আর দেহান্তের পর তাঁর এস্টেটের দ্বায়িত্ব বর্তায় তাঁর ভাইপো জেমস হ্যামিলটনের উপর। কিন্তু কার্যত এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ম্যানেজার সুধাংশু ভূষণ মজুমদারের হাতে। এই সময় থেকেই এস্টেটের অফিশিয়াল / ম্যানেজারদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে  দুর্নীতি, চাষীদের ওপর অত্যাচার, বেআইনি ভাবে চাষজমির ভাড়া বাড়ানো, জমিদখল ইত্যাদি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। উল্টে  চাষীরাও প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও যথাসাধ্য দমন করার চেষ্টা হয় এস্টেটের পক্ষ থেকে। ম্যানেজারদের মদতে প্রজাদের উপর পুলিশি অত্যাচার আর ধরপাকড় শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই গা জোয়ারী, তার প্রতিবাদ আন্দোলন এই সব কিছুর মধ্যেই অনতিবিলম্বেই রাজনৈতিক রঙ লাগে। আগে যা কোনদিনও হয়নি, সেই লড়াই, ঝগড়া, মামলা মোকদ্দমাও পুরোদমে শুরু হয়ে যায়।

এভাবেই চলছিল, এর পর জমিদারিপ্রথার অবসান হয় ১৯৫৬ সালে। এস্টেটের দ্বায়িত্ব বর্তায় হ্যামিলটন চ্যারিটেবল ট্রাস্টের হাতে।  এরপর তৎকালীন শাসক দল কংগ্রেস আর আর এস পির, পক্ষ থেকে চাষীদের মদত দেওয়া হয় ট্রাস্টের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য। জেমস হ্যামিলটন ট্রাস্টের দ্বায়িত্বে ছিলেন ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ডামাডোল শুরু হওয়ার পর তাঁরও বিশেষ কিছু করার ছিল না, দেশীয় ম্যানেজাররাই তখন দাপিয়ে বেরাচ্ছে। এরপর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি যখন সিপিএম সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে, হ্যামিলটন চ্যারিটেবল ট্রাস্টের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। প্রচুর মামলা মোকদ্দমা আর টানাপোড়েন চলার পর নব্বই এর দশকের শেষ দিকে হ্যামিলটন চ্যারিটেবল ট্রাস্ট একটি পাবলিক চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একটি ট্রাস্টী বোর্ড, যার প্রধান হলেন দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার ডেপুটি কমিশনার, বর্তমানে সব কিছু দেখাশুনা করে। এর মধ্যে দুটি বাংলো, প্রাইমারী স্কুল আর একটি ডিসপেন্সারি ছাড়া আর বিশেষ কিছুই ট্রাস্টের অধীনে নেই এবং সেগুলোরও যে ঠিকমত দেখভাল হয় না সেটাও প্রকট।

হ্যামিলটন সাহেব তাঁর জীবৎকালে প্রায় ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে স্বপ্নকে তিলতিল করে গড়ে তুলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরই কিছু লোকের চরম লোভ আর দূষিত রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির খেলায় শেষ হয়ে গেল। আজ গোসাবায় শুধু দুটি কাঠের বাংলো অতীতের গৌরবময় অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার গোসাবা ভ্রমণঃ

গোসাবা সুন্দরবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গঞ্জ। নদী আর খাঁড়ি দিয়ে ঘেরা সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের জন্য সবচেয়ে বড় বাজার হল গোসাবা। ফলে সবসময়ই স্থানীয় মানুষের ভিড়ে গমগম করে। তবে গোসাবা ঠিক ট্যুরিস্ট সার্কিটের মধ্যে পড়ে না। গোসাবায় নদীর উল্টোদিকেই গদখালি। কলকাতা এবং ক্যানিং এর সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আছে। সুন্দরবনের ট্যুরিস্টরা সরাসরি গদখালি ঘাট থেকেই লঞ্চে ভেসে পড়েন। ওপাশে পাখিরালা আর সজনেখালি, সেখান থেকে পারমিট করিয়ে সুন্দরবনের গহনে ঢুকে যান। 

ডিসেম্বরের এক রবিবারের শীতের সকালে একাই মোটরসাইকেলে বেরিয়ে পড়েছিলেম। কিছুদিন আগেই ড্যানিয়েল হ্যামিলটনকে নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশুনা করেছি, আগ্রহও জন্মেছে। গোসাবায় গিয়ে তাঁর এবং রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত বাংলোদুটি দেখে আসার ইচ্ছে মাথা চাড়া দিয়েছিল। বিধিবাম, সঙ্গীসাথী কেউ জুটলো না, অতএব কবিগুরুর একলা চলো রে গানটিকে স্মরণ করেই ক্যামেরা গুছিয়ে বাইকে চড়ে বসলাম।

কলকাতা থেকে গদখালী যাওয়ার দুটি রাস্তা। প্রথম অপশন ই এম বাইপাসে উঠে পরমা আইল্যান্ড থেকে পিসি চন্দ্র গার্ডেনের পাশ দিয়ে গিয়ে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে নেওয়া। অথবা বাইপাস ধরে গড়িয়া হয়ে নতুন ইএম বাইপাস ধরে সোজা বারুইপুর। সেখান থেকে ক্যানিং হয়ে গদখালি।

গুগল ম্যাপের হিসেবে আমার বাড়ির লোকেশন থেকে দুটো রাস্তাতেই দুরত্ব মোটামুটি কাছাকাছিই দেখাচ্ছে,বাসন্তী রোড ধরলে ৮১ কিমি আর বারুইপুর ক্যানিং রুটে মোটামুটি ৮৪ কিমি।

ভেবেচিন্তে প্রথম অপশনটাই নিলাম। বাসন্তী হাইওয়ে রাস্তাটা আমার অসম্ভব প্রিয়। কলকাতার ভিড়ভাড়, জ্যাম, ধুলো, ধোঁয়া কাটিয়ে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে বেরিয়ে প্রকৃতির বুকে হারিয়ে যাওয়ার জন্য রাস্তাটা একেবারে অনবদ্য। একটু এগোলেই দুপাশে সবুজ হামলে পড়ে। সিঙ্গল লেন রাস্তা হলেও কন্ডিশন চমৎকার আর ট্রাফিকের ভিড়ও কম। শুধু কিছু বিচ্ছিরি টাইপের বাঁক আছে আর বাসগুলো পাগলের মত চালায়। তাই একটু সাবধানে চালাতে হয়, ব্যস আর কোন সমস্যা নেই।

ধাপাতে বাসন্তী হাইওয়ে শুরু হওয়ার মুখেই একটা বড় বোর্ড আছে। লেখা আছে

“You are just 86 km away from the UNESCO world heritage site Sundarban”

Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba


এছাড়াও দুপাশে সোনাখালি, গদখালি, বাসন্তী আর ঝড়খালির দূরত্ব লেখা।

এই বোর্ডটা দেখলেই আমার মনে বেশ একটা উত্তেজনা হয়, নাকে যেন বাদাবনের গন্ধ ভেসে আসে, এই রাস্তার শেষেই সুন্দরবন, কথাটা ভাবতেই একটা রোমাঞ্চ লাগে। এ যেন এক মুক্তির ঠিকানা।

কালো চকচকে পিচঢালা রাস্তা, দুপাশে শুধু সবুজ, বাঁদিকে একটা খাল চলেছে রাস্তার সমান্তরালে, দৃশ্য খুব সুন্দর হলেও আমি জানি ওটা আদতে স্যুয়ারেজ ক্যানেল, কলকাতা শহরের সব দুষিত বর্জ্য বুকে নিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জলের রঙ ঘন কৃষ্ণবর্ণ। খানিকটা এগোতেই বানতলার ট্যানারী কমপ্লেক্স ডানদিকে রেখে এগিয়ে গেলাম। এবার ট্র্যাফিক আরো পাতলা হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে শুধু কয়েকটা ঘিঞ্জি জনপদ,বানতলা, ভোজেরহাট, ঘটকপুকুর। মোড়গুলোতে বাস, লরি, সাইকেল, বাইক, ইঞ্জিন ভ্যান সব সরু রাস্তার ওপর জড়াজড়ি করে আছে, হর্ণের শব্দে কান পাতা দায়। কয়েক জায়গায় রাস্তার ওপর বাজার বসেছে, হাজার লোকের দমচাপা ভিড়। এই জায়গাগুলো কোনোমতে কাটিয়ে উঠতে পারলে বাকি রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। বাইক থাকার এটাই সুবিধা কাটিয়ে কুটিয়ে বেরিয়ে আসা যায়। গাড়ি হলে গালে হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় ছিল না।

Sir_Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba


মাঝখানে বড় জায়গা মালঞ্চ, এখানের মাছের পাইকারী বাজার বিখ্যাত। মালঞ্চ থেকেই বাঁদিকে রাস্তা কেটে গেছে টাকী হয়ে বসিরহাট আর হাসনাবাদ। আমি যাবো সোজা। এখানেই থেমে একটা মিষ্টির দোকানে কচুরি, আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলাম, কারণ বেলা হয়েছে আর এর পর সেই বাসন্তীর আগে পথে কিছু খাবার পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে ঘোর সংশয় আছে।

মালঞ্চ ছাড়াতেই রাস্তার দুপাশে দৃশ্যপট পাল্টালো, দুপাশেই দিগন্তবিস্তারী জলাভূমি, সকালের রোদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। এগুলো সব মাছের ভেড়ি, অগভীর জলে মাঝে মাঝে কাদার চর জেগে রয়েছে, সেখানে কোঁচ বক আর পানকৌড়িদের বিচরণ। দূরে মাঝেমধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো চিমনির সারি, কয়েকটার মাথা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। এগুলো সব ইঁটভাঁটা। নদীর পলি পড়া এঁটেল মাটি সুলভ হওয়ার জন্য এই অঞ্চলে ইঁটভাঁটার রমরমা।

Sir_Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba

দেখতে দেখতে বাসন্তী পেরিয়ে গেলাম। এখান থেকে রাস্তা আবার দুভাগ হয়েছে, একটা চলে গেছে ঝড়খালি আর অন্যটা সোনাখালি হয়ে গদখালি। একদফা চা আর সিগারেটের জন্য এখানে পাঁচ মিনিটের ব্রেক বরাদ্দ করলাম। এরপর আর না থেমে সোজা গদখালির ঘাট। এবার রাস্তায় দেখলাম পিকনিক পার্টির বাস আর ট্রাকের ভিড় বাড়ছে, গাড়ীতে করে দল বেঁধে সুন্দরবনের পর্যটকরা চলেছেন। দেখতে দেখতে সোনাখালি এসে গেল, এখানের ঘাট থেকেও সুন্দরব দর্শনের লঞ্চ ছাড়ে। আমার গন্তব্য আরো এগিয়ে গদখালির ঘাট।

গদখালির ঘাটে পৌঁছে দেখি ভিড় গিজগিজ করছে। সরু রাস্তা যেটা ঘাটে গিয়ে শেষ হয়েছে তার দুপাশে শুধু ট্যুর অপারেটরদের অফিস, ভাতের হোটেল আর মিষ্টির দোকান। রাস্তার দুপাশে যেখানেই খোলা জায়গা আছে সেখানে পার্কিং এর রমরমা ব্যবসা। ট্যুরিস্ট বাস থেকে, ছোট গাড়ি, বাইক সব কিছু রাখার ব্যবস্থা আছে দক্ষিনার বিনিময়ে। তার উপর সুন্দরবন উৎসবের সেটা ছিল শেষ দিন, ফলে স্থানীয় মানুষদের ভিড়ও যথেষ্ট।

Sir_Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba


নদীর উল্টোপারেই গোসাবা। দেশী বোটে মোটরসাইকেল পার করে দেওয়ারও বন্দোবস্ত আছে কিন্তু আমি আর সে হ্যাপায় যাইনি। খুঁজে পেতে ঘাটের সামনেই একটি ভাতের হোটেলের সামনে বাইক পার্ক করে হেলমেট দোকানদারের জিম্মায় রেখে দিলাম। না এর জন্য পয়সা লাগেনি কিন্তু অলিখিত চুক্তি হল ফিরে এসে ওই হোটেলেই ভাত খেতে হবে। তাতে আমার অসুবিধা নেই, হিসেব করে দেখলাম, হাতে যা সময় আছে গোসাবা ঘুরে বেলা দুটোর মধ্যে এখানে ঢুকে যাব। সুতরাং লাঞ্চ এখানেই খেয়ে নেওয়া যাবে।

এবার এলাম ঘাটে। গদখালির মুল ঘাট থেকে সুন্দরবন বেড়ানোর লঞ্চ ছাড়ছে। দলে দলে পর্যটকরা উঠছেন। দেখলাম তার মধ্যে বেশ কিছু বিদেশী পর্যটকও আছেন। জানা গেল এই ঘাট থেকে গোসাবার বোট পাওয়া যাবে না, তার জন্য আগে একটা ঘাট আছে। পায়ে পায়ে চলে এলাম সেখানে, মুল ঘাট থেকে মাত্র দুতিন মিনিটের হাঁটাপথ। এই ঘাট তুলনায় ফাঁকা। শুধু কিছু স্থানীয় মানুষজন আছেন। অনেকেরই হাতেই বড় থলি, বস্তা ইত্যাদি রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে বাজার করে যে যার গ্রামে ফিরছেন। বোট সার্ভিস ১৫ থেকে ২০ মিনিট অন্তর অন্তর। এখানে লঞ্চ নেই, দুই সিলিন্ডারের ইঞ্জিন লাগানো দেশী নৌকা। পারানির কড়ি মাত্র পাঁচ টাকা, ওপারে গদখালির ঘাটে নেমে পয়সা দিতে হবে। আগের বোটটা একটু আগেই ছেড়ে গেছে, সুতরাং মিনিট পনেরো দাঁড়াতে হল। নদীর ধারে হুহু করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, কিন্তু রোদ চড়া, তাই শীতবোধ কম হচ্ছে। এখানে নদী যথেষ্ট চওড়া। নদীর বুক চিরে মাঝেমধ্যেই লঞ্চ চলে যাচ্ছে। কালো কালো ফালির মতো জেলেদের নৌকা ভাসছে। ওপারে বোঝা যাচ্ছে গোসাবার তটরেখা।

একটু একটু করে ভিড় বাড়ছে ঘাটে। দূরে যখন ফেরী বোট দেখা গেল ঘাটে তখন গমগমে ভিড়। এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি নৌকা ভর্তি করে লোক আসছে এদিকে। ভারের চোটে জল প্রায় নৌকার গলুই ছোঁয় ছোঁয় অবস্থা। দেখে শহুরে লোকের একটু ভয় হওয়া স্বাভাবিক, একে আমি তো সাঁতার জানিনা, আর মাঝনদীতে নৌকা উল্টোলে আমার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি কেউ আটকাতে পারবে না পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কিন্তু স্থানীয়রা নির্বিকার, এটা ওঁদের রোজনামচা, তাই দিব্যি সবাই হুড়োহুড়ি করেই নৌকায় উঠে বসলেন। ছইহীন বড় নৌকা, আমি কোনমতে ব্যালান্স করে পিছনের দিকে গিয়ে গলুইতে হেলান দিয়ে বসে গেলাম।

Sir_Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba




Sir_Daniel_Mackinnon_Hamilton_Gosaba

প্রবল ভটভট শব্দ আর ডিজেলের কালো ধোঁয়া উড়িয়ে বোট ছাড়ল। গোসাবার ঘাট মোটামুটি দশ মিনিটের জার্ণি। এখানে নেমে পারানির কড়ি মিটিয়ে বাইরে এলাম। ঘাটের ঠিক বাইরেই বাজার। বেশ কিছু টোটো দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার কোন ধারণা ছিল না বাংলোদুটি কোনদিকে আর ঠিক কতটা দূরে। সময় বাঁচানোর জন্য ভাবলাম একটা টোটো ভাড়া করে বলি দুটোই দেখিয়ে আবার ঘাটে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। এটা একটা ভুল ডিসিশন। টোটো পেলাম বটে, কিন্তু দেড়শো টাকার নিচে কেউ ঘুরিয়ে দেখাতে রাজি নয়। অগত্যা দেড়শোতেই রাজী হয়ে চড়ে বসলাম। পরে বুঝলাম আমি বোকা বনেছি, কেন সেটা এর পরে পড়লেই বুঝতে পারবেন।

টোটো চড়ার পর ঠিক দুমিনিটের মাথায় চালক বললেন এসে গেছে বেকন বাংলো। ঘাট থেকে মেরে কেটে ৫০০ মিটার এসেছি কিনা সন্দেহ, তার মধ্যেই রাস্তার বাঁ দিকে একটা বেশ বড় ফাঁকা মাঠ পড়ে আর তার একপ্রান্তেই বেকন বাংলো।

Beckon Bungalow where Rabindranath Tagore stayed

কাঠের খুঁটি আর প্ল্যাটফর্মের উপর ভর করে মাটির ফুট চারেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আছে বেকন বাংলো। এই হল সেই বাংলো যেখানে ১৯৩২ সালের ৩০ এবং ৩১শে ডিসেম্বর কবিগুরু থেকে গিয়েছিলেন। সম্পুর্ণ বাংলোটি বার্মা থেকে আনা সেগুনকাঠ দিয়ে বানানো। দুটি ঘর আর চারদিকে ঘিরে কাঠের রেলিঙ্ ওয়ালা বারান্দা। বাংলোর বাইরে ডান দিকে কবিগুরুর পুর্নাবয়ব মূর্তি। নিচে একটি ফলকে দেখা যাচ্ছে ২০০৩ সালের ৬ই ডিসেম্বর বাংলোটির সংস্কার করা হয়। কিন্তু দেখলাম বাংলোটির বর্তমান অবস্থা বেশ করুণ, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। দুটি ঘরই খোলা, ভিতরে আবর্জনার স্তুপ। লোকজন যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনভাবে চললে কিছুদিনেই এই বাংলোর অবস্থা কি হবে ভাবতেই ভয় হয়।

Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore



Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore

Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore

Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


এখান থেকে দেখে শুনে ছবি তুলে বেরোলাম হ্যামিলটন  বাংলোর উদ্দেশ্যে। এটি ছিল ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের নিজস্ব আবাস। প্রতি বছর শীতকালে তিনি এখানে এসে থাকতেন। এই বাংলো থেকেই পরিচালনা হত সমগ্র এস্টেটের কাজ।

বেকন বাংলো থেকে এর দুরত্ব মেরেকেটে দেড় কিলোমিটার, সুতরাং ঘাটে নেমে এই দুটো বাংলো পায়ে হেঁটেই অনায়াসে দেখে নেওয়া যায়, নিতান্ত বৃদ্ধ বা অশক্ত না হলে টোটো ভাড়া করার কোন প্রয়োজনই নেই। যাই হোক এবারে কপালে অর্থদন্ড লেখা আছে, খন্ডাবে কে, কিছু করার নেই।

যাওয়ার পথে নজরে পড়ল একটি নার্সারী স্কুলের একতলা বিল্ডিং। বাউন্ডারী ওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। বিল্ডিং এর সামনে লেখা আছে স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন ট্রাস্ট পরিচালিত অবৈতনিক স্কুল।

Beckon_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


Hamilton's Bungalow where Sir Daniiel Hamilton used to stay

এখান থেকে অল্প দুরেই হ্যামিলটন বাংলো। সামনে একটি পুকুর, সবুজ সাদা রঙ করা বাংলোর ছায়া পড়ছে জলে। এটিও কংক্রীটের থাম ইংরেজীতে যাকে বলে Stilts তার উপর দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটি দেখেছি বেকন বাংলোর ক্ষেত্রে। আসলে এই সব এলাকা বরাবরই সাইক্লোনপ্রবণ। এই দুটি বাংলোই এমনভাবে বানানো যাতে ঝড় ঝাপ্টা সহ্য করে নিতে পারে। এমন ভাবে তৈরী, হাওয়া বাধা না পেয়ে পাস করে যায় সুতরাং ঝড়ের অভিঘাত কম পড়ে। পরপর দুটি দুর্যোগ, ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোন আর সাম্প্রতিক অতীতে আয়লা এবং ফণীর অভিঘাতেও বাংলো দুটির বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নি।

Hamilton's_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


Hamilton's_Bungalow_ Gosaba_Rabindranath_Tagore


এই বাংলোটি ছিমছাম, দেখে মনে হল বেকন বাংলোর তুলনায় এর রক্ষণাবেক্ষণ অনেক ভালো। বাংলোর ভিতরে হ্যামিলটন সাহেবের স্মৃতি বিজড়িত বেশ কিছু ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস, পারিবারিক ছবি ইত্যাদি আছে। এছাড়া তিনি সেই সময় পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহের জন্য বিলেত থেকে ফিল্টারিং মেশিন আনিয়েছিলেন। তার অংশবিশেষও এখানে রাখা আছে।

Hamiltons Bungalow Gosaba


আমার দুর্ভাগ্য সেদিন বাংলো বন্ধ ছিল। খোঁজাখুঁজি করেও খোলানোর লোক পাইনি, ফলে বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হয়েছিল। ভিতরের জিনিসগুলির ছবি তুলব ভেবেছিলাম তা আর হয় নি।

মোটামুটি ঘন্টা খানেকের মধ্যে দুটো বাংলো দেখা শেষ করে আবার ঘাটে ফিরলাম। হ্যামিলটন বাংলো খোলা থাকলে  ভিতরের জিনিসগুলি খুঁটিয়ে দেখতে আর একটু বেশী সময় লাগতো।

গদখালি ফিরে ভাতের হোটেলে জমিয়ে গরম গরম ভাত, ডাল তরকারি আর মুরগীর ঝোল খেয়ে সাড়ে তিনটের মধ্যে ফেরার রাস্তা ধরেছিলাম। এবার আর বাসন্তী হাইওয়ে ধরিনি। একটু বৈচিত্র দরকার ভেবে, ক্যানিং, বারুইপুর হয়ে ফিরেছিলাম। রাস্তা ভালো, শুধু ক্যানিং, বারুইপুর রাস্তায় অসংখ্য হাম্প আছে যেটা রীতিমতো বিরক্তিকর। এছাড়া ফিরতে কোন সমস্যা হয়নি।

কিভাবে যাবেনঃ

কলকাতা থেকে বাসন্তী হয়ে গদখালি বাস সার্ভিস আছে। অথবা শেয়ালদা সাউথ সেকশনের ট্রেন ধরে ক্যানিং পর্যন্ত এসে এখান থেকে বাসে বা শেয়ারের ম্যাজিক গাড়িতে চলে আসুন গদখালি। এখান থেকে প্রতি পনেরো, বিশ মিনিট অন্তর ছাড়ছে গোসাবা যাওয়ার ফেরী। গাড়িতে বা মোটরসাইকেলে এলে, গদখালির ঘাটে পার্কিং এর ব্যাবস্থা পাবেন। এখানে গাড়ী বা বাইক রেখে ফেরীতে পার হয়ে গোসাবা।

কি খাবেনঃ

গোসাবা ঘাটে খাবার হোটেল আছে আবার গদখালির ঘাটে যে কোন ভাতের হোটেলে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে পারেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি আসার রাস্তায় খাওয়ার অপশন খুবই কম। ঘটকপুকুর বা মালঞ্চতে কিছু খাবার দোকান পাবেন। সেই মতো প্ল্যান করবেন। মিনারেল ওয়াটার সব জায়গাতেই পাওয়া যাবে, অসুবিধে নেই।

পরিশিষ্টঃ
এক দিনের ট্রিপে অনায়াসে এই ঐতিহ্য আর ইতিহাস বিজড়িত বাংলো দুটিকে দেখে আসতে পারেন। সজনেখালী হয়ে সুন্দরবন বেড়াতে গেলে, টুক করে একটু সময় বার করে গোসাবায় নেমে পায়ে হেঁটেই ঘুরে নিতে পারেন এই দুই বাংলো। 

Tuesday, May 16, 2017

অন্য সুন্দরবনের গল্প

Samshernagar and Jhingekhali Forest Range:Sundarban

Jhigekhali Watch Tower and Forest Range Sundarban

মনটা পালাই পালাই করছিল বহুদিন ধরেই কিন্তু নানারকম চাপে ব্যাপারটা আর হয়েই উঠছিলনা। মানে এবারের সুন্দরবন যাত্রাটা। সুন্দরবন আমি গেছি বহুবারই, জলে জঙ্গলে বাদাবনে ঘোরাঘুরি কম হয় নি, কিন্তু এবারের আকর্ষণ ছিলো কিছুটা অন্য।সজনেখালি, সুধন্যখালি, দোবাঁকির চেনা পথ ছেড়ে এবার উত্তর চব্বিশ পরগণার বাংলাদেশ ঘেঁষা অচেনা জঙ্গলের স্বাদ নেওয়া। জঙ্গল এখানে তুলনামুলক ভাবে অনাঘ্রাত, সাধারণ সার্কিটগুলোর মতো এখনো অত ট্যুরিস্টলাঞ্ছিত নয়। 

আমার এই দিকের জঙ্গলের প্রেমে পড়া ধীমানের হাত ধরে, ফেসবুকে যে আছে ‘সুন্দরী সুন্দরবন’ নামে। ধীমান এই এলাকারই ছেলে।বাড়ি হেমনগর কোস্টাল থানার পাটঘরা গ্রামে। সুন্দরবনকে ও নিজের হাতের তালুর মতই চেনে। ধীমানের ফেসবুকের দেওয়ালে অসংখ্য মনকাড়া ছবি দেখেই সুন্দরবনের এই অঞ্চলটার সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠা। ওর প্রোফাইলেই আমার দেখা শুরু প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের জীবন্ত জলছবি। বাদাবন,বন্যপ্রাণ আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষগুলির জীবনের গল্প উঠে আসে ধীমানের ক্যামেরায় আর লেখনীতে। সর্দারপাড়া ফেরিঘাট, কাটোয়াঝুরি আর ঝিঙেখালির জঙ্গল, আদিবাসিপল্লি, গ্রামজীবনের রোজনামচা, ভাটিয়ালী গান আর মোরগলড়াই এর কাহিনী এসেছে ফিরে ফিরে।ক্যামেরার মুন্সিয়ানা তো আছেই এছাড়া ধীমানের লেখার হাতটিও ভারী মিষ্টি, এক অনাবিল সরলতা আর বাদাবনের সোঁদা গন্ধ মাখানো থাকে তাতে।

এই লেখা আর ছবির টানেই যাওয়ার ইচ্ছেটা তৈরী হচ্ছিল, ধীমানও বহুবারই বলেছে চলে আসার জন্য, ইচ্ছে ও নিজে সঙ্গে করে আমাকে সুন্দরবন চেনাবে। এরপর যখন ও জানালো ওর স্বপ্নের বাগান বাড়ি ‘প্রসূন’ প্রস্তুতির পথে তখন গিয়ে পৌঁছানটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

আমি দেখেছি আমার জীবনে প্ল্যান প্রোগ্রাম করে বিশেষ কিছু কোন দিনই করে দেখাতে পারিনি, ওই হুট করে যকে বলে ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ গোছের ব্যাপার না হলে আমার আর ঘর ছেড়ে বেরনো হয়ে ওঠে না। সুতরাং এবারো তাই, বন্ধু সুমিত বলল যাবে আর প্রায় একদিনের নোটিসে বেরিয়ে পড়া। সুমিতের মতলব অন্য, সে ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার, সে চলেছে পাখপাখালির খোঁজে, সঙ্গে মহার্ঘ্য ক্যামেরা আর তার সাথে হাউইটজার কামানের মতো দেখতে লেন্স।সামশেরনগরের নদীর আশেপাশে নাকি পাখির মেলা বসে।সেগুলিকে ক্যামেরাবন্দি করা সুমিতের লক্ষ্য।আমার এই ভুতটা অত মাথায় চাপেনি, আমি চলেছি গ্রাম আর তার মানুষগুলোকে দেখতে। হাতে সময় মোটে একদিন, মানে পুরো চব্বিশ ঘন্টাও নয় কিন্ত তাই সই, যেতে তো হবেই।

বাইকবাহনে যাত্রা শুরু, ইএম বাইপাস থেকে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে ঘটকপুকুর, মিনাখাঁ হয়ে সোজা মালঞ্চ। সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরে ইছামতি নদীর তীরে টাকী ছুঁয়ে হাসনাবাদ।এদিন আকাশের মুখ সকাল থেকেই গোমড়া।আগের দিনই ঝকঝকে রোদ ছিল আর শেষ জানুয়ারীর ঠান্ডার আমেজ।কিন্তু এদিন হঠাৎ পুরো উলটো, সকাল থেকেই মেঘের দাপট, বাসন্তী রোডে উঠতেই শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি। কিন্তু কিছু করার নেই, বেরিয়ে যখন পড়েছি। সুমিতের কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগটা শুধু সামলে রাখার দায়। শহর ছাড়িয়ে একটু এগোতেই দুপাশে সবুজের বন্যা, কখনও বা দিগন্ত বিস্তৃত ভেড়ি, রাস্তার দুপাশে গাছের চাঁদোয়া। মাঝে মাঝে ছোট ছোট জনপদ, বাজার পেরিয়ে যাচ্ছি।কিছুক্ষনের মধ্যেই টাকীকে পাশে ফেলে হাসনাবাদ, এখান থেকে নদীর ওপর ফেরি পেরিয়ে চলে যাব উল্টো দিকে পারহাসনাবাদ।সেখান থেকে আবার হাসনাবাদ হিঙ্গলগঞ্জ রোড ধরে হিঙ্গলগঞ্জ পার করে সোজা লেবুখালি। সেখানে দ্বিতীয় বারের মতো ফেরি পার।ওপারে দুলদুলি হেমনগর রোড ধরে যোগেশগঞ্জ বাজার।সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে সর্দারপাড়া ফেরিঘাটের দিকে কিছুটা গেলেই পাটঘরা গ্রাম, আমাদের গন্তব্য।

কিছুটা ভিজে আর বেশ কিছু কাদা মেখে হাসনাবাদের ঘাটে পৌঁছে খোঁজ করলাম বার্জের, মোটরসাইকেল নিয়ে পার হতে হবে।কিন্ত কোথায় বার্জ, সেতো উল্টো দিকের ঘাটে ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে, এপারে আসার নামই নেই আর আমরাও দাঁড়িয়ে আছি। মধ্যে তিনটে সিগারেট শেষ, সুমিত বোর হয়ে ব্যাগ থেকে ওর গোদা ক্যামেরা বের করে নদীর তীরে কাদায় চরে বেড়ানো পাখির ছবি তুলতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। দেখাদেখি হাম কিসিসে কম নেহি বলে আমিও আমার পুঁচকে ক্যামেরা তাক করে ছবি তুলতে লাগলাম।কাদা ঘেঁটে বেড়ানো পাখিগুলোর একটা নাকি ‘কমন স্যান্ডপাইপার’ আর অন্য লম্বা ঠ্যাংওয়ালা পাখিটাকে বলে ‘লং টোড স্টিন্ট’। এসব সুমিতের থেকে ঝাড়া বিদ্যে, এ ব্যাপারে আমার নিজের ফান্ডা শুন্য। আমার তো একটাকে দেখে সেই টেনিদার বলা কুরুবকের মতো লাগলো, আর অন্যটা নিশ্চই কাদাখোঁচা।সেই ছবিগুলোই পোস্টিয়ে দিলাম।
Samshernagar Sundarban Hasnabad Ferry Ghat
Hasnabad Ferry Ghat

Long Toed Stint Bird at Samshernagar Sundarban
Long Toed Stint, Samshernagar, Sundarban :Photo Courtsey - Sumit Biswas
কিন্তু দুঃসংবাদটা শুনলাম একটু পরেই, বার্জ নাকি ওপারে যথেষ্ট সংখ্যায় গাড়ি না পেলে এপাশে ভিড়বে না, তাতে নাকি তার লস, আর কখন যে সে ভর্তি হবে সে বলা ভগবানেরও অসাধ্য।অতএব বিকল্প কি না দেশী নৌকায় বাইক পার। গেলাম অন্য ঘাটে, কিন্তু সেখানে ব্যাবস্থাপনা দেখে চক্ষু চড়কগাছ।কংক্রিটের ভাঙ্গা ঘাট ধাপে ধাপে নেমে গেছে, ভাটার টানে নদীর জল অনেকটা নীচে, আর নৌকার ডগাটা শুধু ঠেকে আছে ঘাটের ধাপের সঙ্গে।এর মধ্যেই প্রায় ট্র্যাপিজের খেলা দেখিয়ে হ্যান্ডেলবার ধরে নিজেকে এবং মোটরসাইকেলকে ব্যালান্স করে নৌকায় নামতে হবে। একজন লোক আছে শুধু পিছন থেকে বাইকটাকে ধরে রাখার জন্য, কিন্তু নামাতে গিয়ে হড়কে একটু বেসামাল হলেই হয় বাইক সুদ্ধু জলে অথবা ঘাটের কংক্রিটের ধাপে লেগে হাড়গোড় ভাঙ্গবে, বাইকেরও বারোটা বাজবে।আবার গোদের ওপর বিষোঁড়ার মতো বৃষ্টির জন্য ঘাটের ধাপগুলো পিছল। যাই হোক হৃৎপিণ্ড প্রায় মুখে এনে, দুবার হড়কে, প্রায় ফেলে দিতে দিতে মাঝিদের থেকে যথেচ্ছ ঝাড় খেয়ে নিজেকে আর বাইককে তো কোনরকমে নামালাম। কিন্তু ওপারে গিয়ে আবার রিপিট টেলিকাস্ট, বাইক ঘাটে তুলতে গিয়ে। এতেও মুক্তি নেই, ঘাট থেকে ডাঙ্গায় উঠতে অনেক ধাপ খাড়াই সিঁড়ি চড়তে হয়। সিড়ির মাঝখানে একটা সরু কংক্রিটের র‍্যাম্প করা আছে, ঠিক বাইকের চাকার মাপে, সেখানে বাইকটাকে সোজা করে ধরে রেখে, ইঞ্জিন চালিয়ে গিয়ারে ফেলে ধীরে ধীরে ওঠাতে হয় আর নিজেকে পাশে পাশে হ্যান্ডেলবার ধরে ব্যালান্স করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে।সে এক বিষম কঠিন ব্যাপার। বিশদে আর না গিয়ে বলছি, লেবুখালির জেটিতেও বার্জ পাইনি অতএব একই ঘটনা ঘটেছিল। 
Ferry Crossing Hasnabad Ghat
Crossing on a country boat - Hasnabad Ferry Ghat
এই দুটো ঘাট পেরোতেই যা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তা ছাড়া বাকি জার্নিটা ভারী সুন্দর ছিল, ভীষণ আনন্দ করে গেছি চারপাশ দুচোখ ভরে দেখতে দেখতে। বৃষ্টিটাও শেষের দিকে ধরে গিয়েছিলো।যোগেশগঞ্জ বাজারে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় দেড়টা। 

সেখান থেকে আবার ডানদিকে যে রাস্তা চলে গেছে সর্দারপাড়া ফেরিঘাট সেই রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়েই ছবির মতো গ্রাম পাটঘরা।সেখানেই ধীমানের সাধের বাগানবাড়ী “প্রসূণ”।সেটিই ছিলো আমাদের একরাতের আস্তানা।

গ্রামটি একবার দেখলেই মনে ধরার মতো। ধীমান জায়গাটি বেছেছে দিব্যি।পাকা রাস্তা থেকে নেমে ইঁটবিছানো পথ চলে গিয়েছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে। দুপাশে মাটির বাড়ি, খড়ের চালা,বেড়ার ধারে ফুলের গাছ, নিকোন উঠোন, সেখানেই বাচ্চাদের হুড়োহুড়ি, মেয়েরা সব ঘরকন্নার কাজে ব্যাস্ত, দড়িতে শুকোচ্ছে রংবেরঙ্গের শাড়ী,জামাকাপড়। কোথাও একধারে মাটির চুলোতে হাঁড়ি চড়েছে, ভেসে আসছে রান্নার সুবাস,আঙিনার এককোণে উপছে পড়া ধানের মরাই, আবার কোথাও চলছে মাঠ থেকে সদ্য কেটে আনা ধান ঝাড়াই, পুরুষ মহিলা সবাই হাত লাগিয়েছে সমান তালে।সোনারঙ্গা খড় কেটে গোড়া বেঁধে চলছে নতুন করে ঘর ছাওয়ার কাজ।গোয়ালে গরুরাও ভাগ পেয়েছে খড়ের, জাবর কাটছে তারা।ছোট ছোট পুকুরে হাঁসের দল। এক্কেবারে যেন জলরঙে আঁকা ছবি। তবে দেখে বোঝা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণূ।প্রায় প্রতিটি মাটির বাড়ীর খড়ের চালে উঁকি মারছে ডিশ অ্যান্টেনা।ইলেকট্রিসিটির সমস্যা নেই,রাত্রে দেখেছিলাম প্রায় সব বাড়ীর জানলা দিয়েই এলইডি বাল্বের আলোর ছটা।
Patghara Village Samshernagar Sundarban
Patghara Village

Patghara Village Samshernagar Sundarban
A small kid comes out to play Patghara Village
সর্দারপাড়া ফেরীঘাট হলো এই অঞ্চলের এক গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। নদীমাতৃক সুন্দরবনের যাতায়াত, পরিবহন সবই কিন্তু নদী বেয়ে, এখানে বোটই ভরসা মানে লাইফলাইন যাকে বলে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা বহুক্ষেত্রেই অপ্রতুল এবং সময়সাপেক্ষ। মোটরসাইকেলে আসার সময়ই আমরা কিছুটা টের পেয়েছি। যোগেশগঞ্জ বাজারের প্রায় সব মালপত্রই নৌকা চে্পে আসে ধামাখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, ক্যানিং বা আরও বহু দুরদুর জায়গা থেকে।সর্দারপাড়া ঘাটে তাই দিনভর ব্যাস্ততা আর হাঁকাহাঁকি, ঠিক যেন আমাদের বড়বাজার। শুধু তফাৎ হলো লরীর বদলে বোট থেকে মাল বোঝাই হচ্ছে বা খালাস হচ্ছে, লোক যাতায়াতও চলছে, বাসের মতোই ঠেসে লোক উঠছে বোটে।
Sardarpara Ferry Ghat Samshernagar Sundarban
A busy day at Sardarpara Ferry Ghat
এবার একটা ইন্টেরেস্টিং ব্যাপার আছে, এই সর্দারপাড়া নামটা নিয়েই। ধীমানের কাছ থেকেই খানিকটা শোনা। কিছু্টা আশ্চর্যজনক ভাবেই এই অঞ্চলটি আদিবাসী অধ্যুষিত। আদিবাসিদের বলা হয় সর্দার আর তার থেকেই সর্দারপাড়া নাম, মানে সর্দারদের পাড়া আর কি। বহু বছর ধরেই আদিবাসীরা এই অঞ্চলের বাসিন্দা, হয়ত কয়েক প্রজন্ম আগে ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে এদের পুর্বপুরুষরা এসে ঘাঁটি গেড়েছিলেন এখানে। কিন্তু অতদিন আগে ছোটনাগপুরের পাহাড় জঙ্গল ছেড়ে এই বাদাবনে, যেখানে জলে কুমীর আর ডাঙ্গায় বাঘ সেখানে কেনই বা কি উদ্দেশ্য নিয়ে যে এঁরা এসে পড়েছিলেন সেটা গবেষণার বিষয় হতেই পারে। কিন্তু এই মানুষগুলি এখানে ঘর বাঁধার পর বহু বছর ধরে এঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর লোকাচার বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির পাশাপাশি বয়ে যেতে থাকে। এখানে কেউ কারুর স্বতন্ত্রতা না হারিয়েও এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরী হয়ে গেছে। তাই ভাটিয়ালির পাশাপাশি এ অঞ্চলে শোনা যায় ধামসা মাদলের বোল, বনবিবির পালা আর ঝুমুর গানের সঙ্গে মিশে যায় টুসুগানের সুর।নবান্ন উৎসবের উদ্দীপনায় লাগে বাঁধনা পরবের রঙ, আর আসর বসে মোরগ লড়াইয়ের।

ইচ্ছা ছিলো এই মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ জমানোর আর জানার চেষ্টা কিসের টানে তাদের পুর্বপুরুষরা এসেছিলেন পাহাড় আর শাল পিয়ালের জঙ্গল ছেড়ে নদীঘেরা এই বাদাবনের দেশে।ধীমান আশ্বাসও দিয়েছিলো নিয়ে যাবে কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো সময়টাই। তাই এটাও তোলা রইল পরেরবারের জন্য।

“প্রসুণ” কিন্তু আমাদের মুগ্ধ করেছে। একবিঘার ওপর জমিতে যেন অচিনপুরের  বাড়ী। গেট পেরিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে দুটি ঘর, আর একটি সবে গড়ে উঠছে, ডানদিকে একটা মঞ্চ।পিছনে একটি পুকুর আর তার পরেই ধীমানের নিজের হাতে গড়ে তোলা শাল আর ইউক্যালিপ্টাসের বন। ফনফন করে বাড়ছে গাছ। সামনের মাটির ঘরে খড়ের চালা, কিন্তু ভিতরে আরামদায়ক বন্দোবস্ত। বড় ঘর, দুটি করে ডাবল বেড,এক এক ঘরে চারজন আরামসে হাতপা ছড়িয়ে থাকার মত। বাথরুমে কমোড, বেসিন সবই মজুদ, মায় ঘরে এলইডি টিভি পর্যন্ত। যদিও সেটা চালানোর কোন তাগিদ বোধ করি নি।
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Homestay Prosun at Patghara Village
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Homestay Prosun at Patghara Village
এতো গেল নেহাতই ইঁট কাঠ আর উদ্ভিদের গল্প। কিন্ত আসল যেটা পেয়ে মন ভরে গেছে আর যেটার গভীরতা মাপার সাহস বা ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই সেটা হল আতিথ্যের উষ্ণতা।আমাদের থাকার প্রতিটি মুহুর্তের খেয়াল যেভাবে ধীমান এবং তার সঙ্গীরা রেখেছে, বিশেষ করে ধীমানের ছায়াসঙ্গী পচা, তাতে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করার ইচ্ছা আমার নেই। পচা আর তার বন্ধুরা যেভাবে প্রবল উৎসাহ নিয়ে আমাদের সঙ্গে জলে জঙ্গলে, হেঁটে, ইঞ্জিন ভ্যানে আর নৌকায় টৈ টৈ করেছে, ঝিঙেখালির জঙ্গল আর সামশেরনগর চিনিয়েছে তা অনবদ্য।

আর পেটুক মানুষের আসল কথাটা না বললেই নয়। এই দুইদিনে যে হারে পেটপুজো করেছি তাতে আমি নিশ্চিত কম করে তিন কেজি ওজন বৃদ্ধি করে এসেছি (এবং সেটা দস্তুরমতো বেশ অনেক পথ হাঁটাহাঁটি করার পরও)। আমি আর সুমিত দুজনের খাওয়ার বহর বকরাক্ষসের ঈর্ষার কারণ হতে পারত। আর হবে নাই বা কেন, প্রথমদিন দুপুরে শুরুই হলো গরম ডাল, ভাতের সঙ্গে দেশী মুরগীর ঝোল আর বাগদা চিংড়ীর মালাইকারী দিয়ে। সন্ধ্যেবেলা জলযোগ সদ্য ধরা ভেটকি আর আমুদি মাছ ভাজা আর রাত্রে হাঁসের মাংস। পরের দিন দুপুরে আবার কাঁকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত।  গীতাদি মানে গীতা বৈদ্য, যিনি রেঁধেছিলেন আমাদের জন্য এই দুদিন, উনি যে উঁচুদরের শিল্পী এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, হাতে যাদু আছে। কাঠের আঁচে এই রান্না বহুদিন মুখে লেগে থাকবে। এই আনন্দ বোঝানোর জন্য আমার ভাষায় কুলোবে না, টেনিদার স্মরণ নিতেই হবে, মানে একেবারে যাকে বলে ডিলা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক।
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Gita Baidya the culinary artist at work 
এর পরে রয়ে গেলো ঝিঙ্গেখালি জঙ্গল আর সামশেরনগরের গল্প। 

পৌঁছানোর পর কব্জি তো দুরের কথা, আমি আর সুমিত প্রায় কনুই পর্যন্ত ডুবিয়ে দুপুরবেলা খেয়েছি। তারপর দুজনের অবস্থা হল সদ্য আস্ত হরিণ গেলা অজগরের মতো। শরীর বিছানা চাইছে, কিন্তু হাতে সময় বড় কম, যা পারি দেখে নিতে হবে সন্ধ্যে হবার আগেই। কাল শুধু সকালটা পাব, দুপুরবেলাতেই ফেরার পথ ধরতে হবে। অতএব দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, মনের জোরকে প্রায় শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আজকের গন্তব্য ঝিঙ্গেখালির জঙ্গল আর ওয়াচটাওয়ার। সঙ্গে চললো ধীমানের বিশ্বস্ত লেফটেন্যান্ট পচা, আমাদের গাইড হয়ে। তখন বৃষ্টিটা সবে ধরেছে, শীতের বিকেলের মরা আলো বেরিয়েছে। এবার আমরা সওয়ারী ইঞ্জিন ভ্যানে। ঝকঝক আওয়াজ করতে করতে, চীনে ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে, গ্রামের পথ বেয়ে চললো আমাদের বাহন। পাটঘরা গ্রাম ছাড়িয়ে পাঁচ ছ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যোগেশগঞ্জ বাজার, আমরা এসেছিলাম এই পথ ধরেই। যোগেশগঞ্জ চৌমাথা থেকে সোজা রাস্তা গেছে কালীতলা বাজার। আমাদের গন্তব্য সেখানেই। কালীতলা বাজারে যখন নামলাম দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। মেঘ প্রায় কেটে গেছে বলে সুর্যদেব উঁকি মারতে শুরু করেছেন। 

কালীতলা বেশ জমজমাট বাজার, দোকানপাট, বাজার বসেছে, সব্জি থেকে মাছ সবরকমেরই, লোকজনের হাঁকাহাঁকিতে সরগরম। নেমেই দৌড়লাম ফেরিঘাটে। ভারী মজার জায়গা, এপাশে এতো মানুষের ভীড়, আলো, হইহল্লা, কিন্তু নদীর ওপারে সুন্দরবনের ঘনসবুজ গম্ভীর গা ছমছম করা জঙ্গল।একটা সরু নদীর এপার আরে ওপারের মধ্যে কি আশ্চর্য বৈপরিত্য। ঘাটে দাঁড়িয়েই দেখলাম, ওপারের জঙ্গল নাইলনের জাল দিয়ে ঘেরা। সুন্দরবনের এই অঞ্চলেই বোধহয় বাঘে আর মানুষের এতো কাছাকাছি সহাবস্থান। আমাদের মতো শহরের লোকের পক্ষে কল্পনা করা মুশকিল অষ্টপ্রহর কি বিপদের সঙ্গে এই অঞ্চলে মানুষ ঘর করেন।বাড়ির পাশেই সাক্ষাৎ দক্ষিণ রায়ের আস্তানা।নাইলনের জালে বাঘ আটকায় কিনা কে জানে, আমার তো দেখে কিছুই ভরসা হলও না। প্রায়ই বাঘ বেরোনর খবর আসে।প্রতি বছর মৃত্যুও ঘটে, সরকারী খাতায় সেগুলো শুধু পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যায়। 

ঘাটে ইতিউতি কিছু নৌকা বাঁধা, দুটো ছোট মোটর লঞ্চ। সামনে নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে সেটা পেরোলেই ঝিঙ্গেখালি ওয়াচটাওয়ারের ঘাট, মেরে কেটে দশ মিনিটের নৌকা যাত্রা। কিন্তু একি কান্ড, কেউই দেখি নিয়ে যেতে রাজি নয়। কেন, নাকি আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি, পৌঁছতে পৌঁছতে টাইম পেরিয়ে যাবে। আর তার পরে ঝিঙ্গেখালি ঘাটে নৌকা ভিড়লে বনবাবুরা গোঁসা হবেন, আর আইন না মানার ফাইনও নাকি আছে। অতএব সব্বাই একযোগে ঘাড় বেঁকিয়ে বসে।অনুরোধ উপরোধেও চিঁড়ে ভিজলো না।তীরে এসে তরী ডোবার এটাই বোধহয় আদর্শ উদাহরণ। পচার মুখটাও একটু শুকনো, আমাদের দুই শহুরে প্রানীকে এতদূর ঠেঙ্গিয়ে নিয়ে এসে জঙ্গলের দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সেটা ওরও ঠিক হজম হচ্ছে না। তারপর সুমিতের কাঁধে বোম্বা লেন্স, ছবি শিকারের জন্য তৈরি কিন্তু বিধি বাম বলেই মনে হচ্ছে। অতএব অগতির গতি হিসাবে পচা আবার ঘাট থেকেই ফোনে ধরল ধীমানকে। দুচার কথা বলেই বললো দাদাকে বলেছি কথা বলতে, একটু দাঁড়ান। আমরাও নেই কাজ তো খই ভাজ বলে ইতিউতি হযবরল ছবি তুলতে লাগলাম, এমনকি সেলফি অবধি। পাঁচ মিনিট পরেই ধীমানের ফোন পচার মোবাইলে, ব্যাবস্থা নাকি হয়ে গেছে, জঙ্গলে নামা যাবে। এবার পচা বীর দর্পে ঘাটে নেমে মাঝিদের বলল ছাড়ো নৌকা সব কথাবার্তা হয়ে গেছে, লাইন ক্লিয়ার। মাঝিদের ধন্ধ তবুও যায় না, ঝোপ বুঝে কোপ হিসেবে ভাড়া হাঁকলো দুশো টাকা।দশ মিনিটের যাত্রার জন্য যা অবশ্যই গলাকাটা। কিন্তু উপায় নেই দায়টা আমাদেরই। সেইজন্য ফাঁদে পড়ে বগা কান্দে রে করে দুশোটি টাকাই কবুল করা গেলো। নৌকায় উঠতেই ঝপ করে আর একজন মাঝবয়সি মানুষ উঠে পড়লেন, জানলাম উনি গাইড, জঙ্গলের পথে এনার উপস্থিতি নাকি মাস্ট। 
Jhingekhali Forest Range and Watch Tower Kalitala Ferry Ghat
Kalitala Ferryghat

Jhingekhali Watch Tower and Forest Range Kalitala Ferry Ghat
Kalitala Ferry Ghat
শুরু হলো নৌকাযাত্রা, বাঁক ঘুরতেই, সহসা দশগুণ হয়ে গেলো নদীর বিস্তার, একদিকে ঝিঙ্গেখালির গভীর জঙ্গল, অন্যদিকে বহুদুরে আবছা ধুসর তটরেখা। ওদিকটা বাংলাদেশ, সেদিকেও ঘন জঙ্গলের আভাস। বেশ কিছুটা তফাতে অলস গতিতে ভেসে যাচ্ছে বাংলা দেশের পতাকা লাগানো একটা জাহাজ।পশ্চিম আকাশে তখন সুর্যাস্তের খুনখারাপী রঙের হোলি খেলা। দুচোখ ভরে দেখছি শুধু।এর মধ্যেই নৌকা ঝিঙ্গেখালি ঘাটে। কিন্তু অবস্থা দেখে চক্ষু চড়কগাছ, নামবো কিভাবে? ভাঁটার টানে জল নেমে গেছে আর তীর জুড়ে থকথকে কাদা, জেটিতে ওঠার আগেই হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডূবে মরব। আমরা কাদা ঘাঁটতে রাজী নই, অতএব উপায়? দেখা গেল আর একটা বোট ভীড়েছে জেটিতে, তার নাকটা ঘাটের সিঁড়িতে ঠেকানো। আমদের মাঝিভাই অনেক চেষ্টা চরিত্র করে, নিজে জলে কাদায় নেমে, নিজের বোটকে নানা কসরতে অন্য বোটটার গায়ে ঠেকিয়ে দিলেন।আমরা ক্যামেরা, জলের বোতল সামলে, হাঁচর পাঁচড় করে ব্যালান্সের খেলা দেখিয়ে অন্য বোটটা পেরিয়ে অবশেষে ডাঙ্গায় পা রাখলাম। নেমে নিজেদের পুরো কলম্বাস মনে হল।
Jhingekhali Watch Tower and Forest Range sundarban
On the way to Jhingekhali watch tower Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
The vast expanse of river Raimangal near Jhingekhali Forest Range Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
View  of  Jhingekhali Forest Range Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
The Ferry Ghat at Jhingekhali Watch Tower Sundarban
ঘাট থেকে উঠেই বনদপ্তরের বিশাল কম্পাউন্ড,বাহারী ফুলের গাছ, কেয়ারী করা বাগান, একটা পুকুর আর শেষ প্রান্তে তিনতলা ওয়াচটাওয়ার। একজন বনকর্মী জানালেন আমরা অলরেডী লেট, অতএব সময় বরাদ্দ ঠিক দশ মিনিট। তাই সই, কারণ তখন প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে, কিছু দেখতে পাওয়ার আসাও ক্ষীন।উঠলাম ওয়াচ টাওয়ারে, সামনে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিপুল বিস্তার। সামনে একটা জলাশয়। তার পিছনে বেশ কিছুটা জঙ্গল পরিস্কার করা, বন্যপ্রানীরা জল খেতে এলে যাতে ওয়াচ টাওয়ার থেকে নজরে আসে। বহু পাখীর ডাক শোনা যাচ্ছে, জঙ্গলে দ্রুত নেমে আসছে অন্ধকার। দুরবীন দিয়ে ইতিউতি দেখার চেষ্টা করলাম, নজরে এলো না কিছুই, এদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে, সুতরাং ক্যামেরা বাইনোকুলার গুটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। আপসোস বিশেষ নেই, এই মায়াবী বিকেলে সুন্দরবনের যে ভাবগম্ভীর রূপ দেখলাম, মস্তিষ্কের হার্ড ডিস্কে সেভ হয়ে থাকবে চিরকাল। 
Jhingekhali Forest and watch tower sundarban
View from Jhingekhali Watch Tower Sundarban
ফেরার পথে কালীতলা বাজারে চা খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে আমাদের তিনচাকার যন্ত্রবাহনে আবার পাটঘরার পথে। সন্ধ্যেবেলা নাকি আমুদি মাছ আর ভেটকি মাছ ভাজার বন্দোবস্ত। আর ডিনারে হাঁসের মাংস আর ভাত। জয়গুরু।

পরের দিন সকালে অভিযান শেষপ্রান্ত সামশেরনগরে। 

সামশেরনগর নিয়ে কিছু কিছু লেখা পড়েছিলাম কয়েকটি ভ্রমণ বিষয়ক পত্রপত্রিকায়। সেসব বর্নণা শুনেই ঠিক করেছিলাম এখানে আসবোই।

দ্বিতীয় দিন আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়লাম।আমরা সওয়ারি তিন চাকার ইঞ্জিন ভ্যানে। ধীমানের বাড়ি থেকে সামশেরনগর ঘন্টাখানেকের পথ। চা খেয়ে উঠে পড়া গেল আর সারথি স্টার্ট দিলেন। ডিসেম্বরের শেষে হাওয়ায় ঠান্ডার কামড়। প্রথমে পড়ে কালীতলা বাজার। গতকাল এখান থেকেই বোটে করে গিয়েছিলাম ঝিঙ্গেখালির জঙ্গলে।এবারে ভ্যান কালীতলা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল সামশেরনগরের পথে। বাজার ছাড়ালেই ফাঁকা রাস্তা। রাস্তাটা ভারি সুন্দর, ডানপাশে একটা খাল আমাদের সঙ্গী হয়েছে। খালের ঠিক ওপারেই ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল।পাড়ে কাদায় অসংখ্য শ্বাসমুল মাথা তুলে আছে। কাদায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দুধসাদা বকের দল। ইঞ্জিনভ্যানের একঘেয়ে ঝক ঝক আওয়াজ ছাপিয়ে জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে অজানা পাখিদের কলকাকলি।পুরো রাস্তাতেই আমাদের সঙ্গী এই খালটা। আমাদের বাঁদিকটা ফাঁকা, ফাকা বেশীরভাগটাই মাঠ আর চাষের জমি। কখনওবা পেরিয়ে যাচ্ছি ছোট ছোট গ্রাম আর জনবসতি, মাটির ঘর, ছোট দোকান, মাঝে চোখে পড়ল একটা বনবিবির থান। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
View on the way to Samshernagar Sundarban
Bonbibi Temple Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Bonbibi Temple Samshernagar Sundarban
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সামশেরনগর। কালিন্দী আর রায়মঙ্গল নদী দিয়ে ঘেরা ভারত ভুখন্ডের প্রায় শেষ প্রান্ত। কালিন্দী নদীর প্রান্তে জিরো পয়েন্ট থেকে ঝাপসা নজরে আসে বাংলাদেশের সীমানা। সীমান্ত অঞ্চল হওয়ার জন্য অবশ্যই স্পর্শকাতর এলাকা, বি এস এফের বিরাট ক্যাম্প রয়েছে আর নদীর ধারে উচুঁ ওয়াচটাওয়ার।হিসেবমত সামশেরনগরের জনবসতি অনেক পুরোন, আসার পথে পড়ল সামশেরনগর স্কুল, দেখলাম দেওয়ালে সিমেন্ট দিয়ে প্রতিষ্ঠা সন দেওয়া আছে ১৯৫৮। তার মানে এর অনেক আগে থেকেই এখানে মানুষের বসবাস।চিন্তা করার চেষ্টা করলাম সেই সময় সামশেরনগরের রূপ ঠিক কেমন হতে পারে, জঙ্গল তখন নিশ্চয়ই ছিল আরও ঘন, আরও ভয়ঙ্কর, বাঘের আনাগোনাও ছিল অনেক বেশী।আর বাঘ আটকানোর জাল তো এই হালে লেগেছে। তার মানে সেই কোন কাল থেকেই এই দুর্গম বাদাবনে জলে কুমীর আর ডাঙ্গায় বাঘ নিয়ে মানুষের জীবনসংগ্রাম শুরু।

এখনও সামশেরনগরের মজা এটাই, জঙ্গল আর লোকবসতি এখানে পাশাপাশি, প্রায় হাত ধরাধরি করে, মাঝখানে ব্যাবধান বলতে শুধু শকুনখালি নদী। তাও তাকে নদী বললে বেশী বলা হয়, খাল বলাই ভালো। চওড়ায় হয়ত মেরেকেটে হাত ত্রিশেক। ওপারেই গা ছমছমে গভীর ম্যানগ্রোভ অরন্য, এত ঘন যে ভরা দিনের আলোতেও দৃষ্টি চলে না ভিতরে।বনদপ্তর থেকে পুরোটা ঘিরে রেখেছে নাইলনের জালে যাতে বাঘ টপকে এপারে আসতে না পারে।কখনও কখনও গভীর রাতে মাটির ঘরে শুয়ে থাকা মানুষের আচমকা ঘুম ভাঙ্গে ওপারের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা বাঘের গম্ভীর ডাকে। এই বন্য পরিবেশে, রাতের অন্ধকারে, পলকা মাটির ঘরে শুয়ে সে ডাক যে শুনেছে সেই জানে শুধু সেই আওয়াজেই কিরকম ভাবে রক্ত জল হয়ে যায়।কখনো বা গ্রামের পথে ভিজে কাদা মাটিতে দেখা যায় তাঁর পায়ের ছাপ, শুধু নাইলনের জাল কি ঠেকিয়ে রাখতে পারে বনের রাজাকে। 

যতই হোক না ভয়ঙ্কর, এই জঙ্গলকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার মানুষগুলির জীবন। সবারই দিন গুজরান হয় সারাদিন নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরে বা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করে। সুন্দরবনের এই অঞ্চলে চাষবাস বিশেষ কিছু হয়ই না, পেটের ভাত জোগায় এই জঙ্গলই আবার হামেশাই এই জঙ্গলই কেড়ে নেয় বহু প্রাণ। যেহেতু জীবন এখানে এত জঙ্গলকেন্দ্রিক, তাই হয়ত বাঘে মানুষে মোলাকাতের সংখ্যাও এখানে বেশ বেশি। তাই মাঝে মাঝেই প্রিয় মানুষটি জঙ্গলে গিয়ে আর ফেরে না, কুঁড়েঘরে ওঠে কান্নার রোল। হতভাগ্য মানুষটির সঙ্গীরা নিঃশব্দে গ্রামে ফিরে আসে মাথা নিচু করে, কখনোবা আধখাওয়া ছিন্নভিন্ন দেহটা কাপড়ে জড়িয়ে।খুব অল্প কিছু সৌভাগ্যবানই জীবিত ফেরে, সাক্ষাৎ মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখে।কোনক্রমে প্রাণটা নিয়ে ফিরলেও যমে মানুষে টানাটানির পর শরীরে গভীর ক্ষতের দাগ আর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় বাকিটা জীবন।কিন্তু কোন মৃত্যুই এখানে জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারে না। জীবন এখানে কঠিন, দারিদ্র নির্মম, তাই শোকের সময়ও এখানে সীমিত। চোখের জল মুছে মৃতের নিকটজনকে আবার সেই জঙ্গলেই ফিরতে হয় পেটের দায়ে, প্রাণ হাতে করে।

সামশেরনগর দেখতে গেলে একমাত্র উপায় হচ্ছে হাঁটা। পৌঁছে আমরা ভ্যান ছেড়ে দিলাম। চালক এখানেই আমাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকবেন। আমরা গঞ্জের মধ্যে অল্প হাঁটা পথ বেয়ে শকুনখালি নদীর ধারে উঁচু মাটির বাঁধে এসে উঠলাম। এবার শকুনখালির তীর ধরে বাঁধের ওপর দিয়ে সোজা হাঁটা।সামশেরনগরকে চিনে নেওয়া এভাবেই। হাঁটাপথে আমাদের বাঁদিকে গ্রাম্যজীবনের চলমান ছবি।কোথাও মাটির ঘরে আঙ্গিনাতে চলছে ধান ঝাড়া, কোথাওবা চলছে জাল বোনা। কোনে ডাঁই করা খড়ের আঁটি।মাদুর পেতে বাচ্চারা বসেছে পড়তে, কয়েকজন আবার হুটোপাটি করে বেড়াচ্ছে। তারে শুকোচ্ছে রংবেরঙের শাড়ী, জামাকাপড়, মাটির উনুনে আঁচ পড়েছে, হাঁড়িতে ফুটছে ভাত।দাওয়াতে বৃদ্ধ,বৃদ্ধারা চাদর মুড়ি দিয়ে রোদ পোহাচ্ছেন। ওদিকে শকুনখালির তীর জুড়েও ব্যাস্ততা। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চলেছে মাছ ধরা, কিছু নৌকা লেগেছে উল্টোপারে জালছাওয়া জঙ্গল ঘেঁষে।বড্ড যেন কাছে। দেখে একটু শিহরণ বোধ হয় আর কি, এমনকি এই পরিষ্কার দিনের আলোতেও।মনে হয় যেকোন সময় জঙ্গল ফুঁড়ে দেখা দিতে পারেন দক্ষিণরায়। আমরা তো দাঁড়িয়ে আছি তাঁর সাম্রাজ্যেই।এখানের এই গা ছমছমে ভাবটাই একটা দারূন অভিজ্ঞতা। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
The path beside river Shakunkhali, samshernagar, Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Kids Studying Samshernagar Sundarban
খালে নৌকার ঝাঁক তো আছেই,  কেউ কেউ তীরে দাঁড়িয়েই হাতজাল ফেলে মাছ ধরছে। বেশ কিছু মহিলা দেখলাম কোমর জলে নেমে জাল জাতীয় জিনিস নিয়ে জল ঠেলে হাঁটছেন। জিজ্ঞাস করতে জানা গেল কাঁকড়া ধরা চলছে। এখানে দেখে বুঝলাম স্ত্রী, পুরুষ ভেদাভেদ নেই, বাইরের কাজে সবাই হাত লাগিয়েছে। নৌকাতে ছেলেদের সঙ্গে মহিলারাও আছেন, দাঁড় বাওয়া থেকে জাল ফেলা সবেতেই, আবার ঘরকন্নার কাজেও। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Fisherman Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Fishermen on boat at the backdrop of the forest
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life goes on at Smshernagar Sundarban
শীতের সকালে এই হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছে। দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি, শকুনখালির ধারে ধারে গাছে পাখির মেলা। হাঁটতে হাঁটতেই নজরে পড়ল দারুণ সুন্দর নীল রঙের ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার, ডানায় ঝিলিক তোলা পার্পল সানবার্ড, স্মল মিনিভেট আর অবশ্য করেই নানারকমের রংবাহারী মাছরাঙা পাখি। কতরকম নাম তাদের, কমন কিংফিশার, কলার্ড কিংফিশার, ব্ল্যাক ক্যাপড কিংফিশার।নদীর জলে পোঁতা বাঁশের খুঁটির ওপর তারা বসে আছে আর থেকে থেকেই তীব্র গতিতে জলে ঝাঁপ দিয়ে ঠোঁটে মাছ নিয়ে উঠে আসছে।
Birds of samshernagar sundarban tourism
Stock Billed Kingfisher, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
White Collared Kingfisher Birds of samshernagar sundarban tourism
White Collared Kingfisher, Samshernagar, Sundarban :Photo courtesy Sumit Biswas
White Breasted Kingfisher Birds of samshernagar sundarban tourism
White Breasted Kingfisher, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
Small Minivet Birds of samshernagar sundarban tourism
Small Minivet, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
Verditer Flycatcher Birds of samshernagar sundarban tourism
Verditer Flycatcher, Samshernagar, Sundarban :Photo Courtesy Sumit Biswas
Small Minivet Birds of samshernagar sundarban tourism
Small Minivet, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
Purple Sunbird Male Birds of samshernagar sundarban tourism
Purple Sunbird Male, Samshernagar, Sundarban: Photo Courtesy Sumit Biswas

Verditer Flycatcher Birds of samshernagar sundarban tourism
Verditer Flycatcher, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
Long Toed Stint Birds of samshernagar sundarban tourism
Long Toed Stint, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
এছাড়াও আরও কতশত পাখির মেলা, আমি অবশ্য এত পাখি চিনিও না বরং এ ব্যাপারে বেশ অজ্ঞ।বন্ধু সুমিতের ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফির শখ, সে কিছু কিছু পাখী চেনালো আর বেশির ভাগ সময়টাই তার কামানের মতো লেন্স উঁচিয়ে ঊর্ধমুখ হয়ে ঝপাঝপ ছবি তুলতে লাগলো। আমার এই বাতিক অতোটা নেই, অতএব আমি নিজের মনে ঘুরতে লাগলাম ইতিউতি। এই করতে গিয়েই চোখে পড়ল, একটা উঁচু গাছের ডালে একটা ভুতুম প্যাঁচা অত্যন্ত গম্ভীর আর বিরক্ত মুখে আমাকে দেখছে। ছবি তুলতে গেলাম কিন্তু সে আমার পুঁচকে ক্যামেরার রেঞ্জের অনেক বাইরে। তবে ব্যাপার স্যাপার দেখে বুঝলাম এই জায়গাটা পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ। পাখিরোগ থাকলে ক্যামেরা দুরবীন বাগিয়ে চলে আসতে পারেন, নিরাশ হবেন না বলতে পারি।
Birds of samshernagar sundarban tourism
Photo Courtesy Sumit Biswas
হাঁটতে হাঁটতে এবারে শকুনখালির শেষ প্রান্তে, যেখানে সে মিশেছে কালিন্দীর সঙ্গে। মোহনায় বিশাল চওড়া কালিন্দী। দুপুরের রোদে নদীর বুকে তখন লক্ষ হীরের ঝিলমিল। দূরে নদীর বুকে অসংখ্য মাছধরা ট্রেলারের ধুসর অবয়ব দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে  হু হু করে, বাঁকের মুখে ঢেউয়ের ঝাপট আটকানোর জন্য ইঁটের বাঁধানো পাড়। তার ওপর বসলাম একটুক্ষণ, অনেকটা হাঁটা হয়েছে, আবার ফিরতে হবে একই রাস্তা ধরে। নদীর ধারে জাস্ট চুপ করে বসে থাকতে আমার বরাবরই ভালো লাগে, এখানেও তার ব্যাতিক্রম নয়। নদীর ওপারে বাংলাদেশের সুন্দরবন, চলে গেছে আরও পুর্বদিকে। জঙ্গল সেখানে আরও ঘন আরও বিশাল তার বিস্তার। পৃথিবীর সর্ব্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে জানতে হলে, এর বৈচিত্রকে বুঝতে হলে আরও অনেক অনেক সময় লাগবে। তাই আবার ইচ্ছা রইলো ফিরে আসার। 
Samshernagar Sundarban Tourism Homestay
View of river Kalindi from zero point: Samshernagar Sundarban
এবারের মতো যাত্রা শেষ। এবার ঘরে ফেরার পালা।

সঙ্গে স্মৃতি হিসাবে থাকল কিছু ছবি। সেগুলোর কয়েকটা দিলাম এখানে। না কোন ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফী নয়, আমার দেখা নিতান্ত সাধারণ কিছু গ্রাম জীবনের টুকরো মুহুর্ত।

সুন্দরবনকে একটু অন্যভাবে দেখতে গেলে, অনুভব করতে গেলে আসতে পারেন এদিকে। যদিও আমি প্রথাগত ভাবে জঙ্গলে ঢুকিনি কিন্তু তার ব্যাবস্থাও আছে ধীমানের কাছে। চেনা  ট্যুরিস্ট সার্কিটের বাইরে সুন্দরবনের এই অঞ্চলে এলে জঙ্গলের এক অন্য রূপ দেখতে পাবেন।থাকবে অচেনা অজানা নদীতে খাঁড়িপথে নিজের মতো ঘোরাঘুরির আর জঙ্গলকে অনুভব করার সুযোগ।সজনেখালি, সুধন্যখালির হুড়োহুড়ি, লঞ্চভর্তি মানুষের হইহল্লা, যাঁরা সুন্দরবনের সম্মন্ধে কিছুমাত্র না জেনেই শুধু ফুর্তি করতে এসেছেন, সেইসব উতপাৎ এখানে নেই। আর হ্যাঁ খালি বাঘ দেখাকে পাখির চোখ করে আসবেন না, তাতে সুন্দরবনের অসামান্য সৌন্দর্য তো কিছুমাত্র উপভোগ করতে পারবেনই না উলটে একরাশ হতাশা নিয়ে বাড়ী যাবেন। মনে রাখবেন এটা রণথম্ভোর বা তাড়োবার জঙ্গল নয়। আপনার ইচ্ছায় নয়, সুন্দরবনের বাঘ তার ইচ্ছায় আপনাকে দেখা দেবে।সেইটা মেনে নিয়ে যদি আসেন আর প্রকৃতিকে ভালোবাসার সংবেদনশীল মনটা যদি থাকে, নিরাশ হবেন না।

এখানে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই কয়েকটা মানুষের কথা যাদের আন্তরিক সাহায্য, ভালোবাসা আর পরিশ্রম না থাকলে এই ছোট্ট বেড়ানোটা এত মনগ্রাহী হত না।এদের কেউই পেশাদার গাইড, ট্যুর ম্যানেজার বা হোটেল ব্যাবসায়ী নয়, কিন্তু যে আন্তরিকতা, ভালবাসা আর যত্নের সঙ্গে আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছে, ২৪ ঘন্টা আমাদের সব সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রেখেছে এক কথায় অনবদ্য। পয়সা দিয়ে কেনা পেশাদারী আথিথেয়তার সঙ্গে এর কোন তুলনাই হয় না। পচা,তরুণ, পাপ্পু, ভোলা, কমবয়সী ছেলে সব, কিন্তু কি অসম্ভব করিৎকর্মা, আর জঙ্গল চেনানোর কি আন্তরিক প্রচেষ্টা।

থাকা আর ঘোরার বন্দোবস্তের জন্য যোগাযোগ করুন ধীমানের সঙ্গে। ঠিকানা নিচে দেওয়া রইলো।

ধীমান মন্ডল।
প্রসূণ, গ্রাম পাটঘরা
থানা হেমনগর কোস্টাল
হিঙ্গলগঞ্জ, উত্তর চব্বিশ পরগনা।
৯০৮৮০৩০৫৮৬/৯৫৪৭১৭১০০/ ৯০০৭৩৩৬৩৫৩