Showing posts with label PICE HOTEL. Show all posts
Showing posts with label PICE HOTEL. Show all posts

Sunday, February 19, 2017

PICE HOTELS OF KOLKATA - HOTEL TARUN NIKETAN তরুণ নিকেতন

HOTEL TARUN NIKETAN-A TRADITION OF OVER HUNDRED YEARS

Hotel Tarun Niketan Pise Hotel Kolkata


এযাবৎ উত্তর এবং মধ্য কোলকাতার অনেকগুলিই অতিবিখ্যাত, অল্পবিখ্যাত এবং অবিখ্যাত পাইস হোটেলেই খাওয়ার সুযোগ হয়ে গেছে।তেমন কিছু কিছু অভিজ্ঞতার কথা আগে লিখেওছিসিদ্ধেশ্বরী আশ্রম, জগন্মাতা হোটেল, জগন্নাথ হোটেল, স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল, এগুলি কোলকাতার পাইস হোটেলের জগতে এক একটি নক্ষত্র। বহু পুরনো ঐতিহ্যবাহি এই প্রতিষ্ঠানগুলি সব ঝড় ঝাপ্টা সামলে, শতবর্ষ পার করে আজও সমানতালে চলছে।যদিও অনেক পাইস হোটেলই আবার ঝাঁপ ফেলেছে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে, তবু পুরনো কোলকাতার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির একটা টুকরো এখনও বেঁচে আছে এই কটি পাইস হোটেলের মধ্যে দিয়ে।তবে আর কদিন থাকবে সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছেই, সব কিছুই বড় তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই জিনিস বেঁচে থাকবে কিনা বা তারাও আর এতে উৎসাহ দেখাবে কিনা তা হয়ত শুধু সময়ই বলতে পারবে।

আমার এক ধরনের নেশা লেগে গেছে। খুঁজে খুঁজে যাই এই ধরনের হোটেল গুলোতে। কারণ মূলতঃ দুটি। প্রথমত তো আমি মার্কামারা ভেতো বাঙ্গালী, সেজন্য পাইস হোটেলের ভালো এবং নিখাদ বাঙ্গালী রান্নার স্বাদের একটা অমোঘ টান তো আছেই। দ্বিতীয় কারণ এই হোটেলগুলোর গায়ে এখনও এক বিগত যুগের অদ্ভুত মন উদাস করা গন্ধ লেগে আছে। প্রাচীন বাড়ির মলিন বিবর্ণ ইঁটের মোটা দেওয়াল, কড়ি বরগার ছাদে ক্লান্ত ফ্যানের ঘুর্নণ, শ্বেতপাথরের টপ দেওয়া কাঠের টেবিল আর চেয়ার, ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা দিনের মেনু, কলাপাতায় ভাত, নুন লেবু আর কখন বা মাটির ভাঁড়ে জল, অচেনা মানুষদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষী করে বসে খাওয়া, কর্মচারীদের নামতা পড়ার মতো সুরে মেনু আওড়ানো, সবমিলিয়ে মনে হয় সময় যেন এই হোটেলগুলোর চার দেওয়ালের মধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেবাইরের ঝাঁ চকচকে আধুনিক কোলকাতা ছাড়িয়ে এখানের চৌকাঠ পেরোলেই হঠাৎ করে এক অন্য জগতে ঢুকে পড়া, যেন টাইম মেশিনে চেপে হুশ করে বেশ কয়েক দশক পিছিয়ে যাওয়া সম্পুর্ণ হারিয়ে যাবার আগে এই সবকিছুরই একএকটা টুকরো ধরে রাখার চেষ্টা আমার অক্ষম কলম আর ক্যামেরায়।

স্বভাবতই পাইস হোটেলের রমরমা উত্তর আর মধ্য কলকাতাতেই বেশী। বহু প্রাচীন অঞ্চল এইসব। সেই সুদুর বৃটিশ আমল থেকে যবে থেকে কোলকাতা ব্যাবসা বানিজ্যে কল্লোলিনী হতে শুরু করেছে সেইসময় থেকেই শুরু হয়েছে রুটিরুজির খাতিরে দেশীয় মানুষের ঢল। আর এই মানুষগুলিকে সন্তায় খাওয়ানোর জন্য কালের নিয়মে আস্তে আস্তে গোড়াপত্তন হয় পাইস হোটেল কালচারের। এবং শুধু সস্তা নয় এমন স্বাদের ঘরোয়া খাওয়া যা তাঁদের বাড়ির রান্না না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও তো ভোলাবেই। আর একটা অবশ্য শর্ত আছে সব পাইস হোটেলেরই, সব রান্নাই হতে হবে অতি হালকা আর সহজপাচ্য। রোজকার খাওয়া যাতে পেটরোগা বাঙ্গালীর অম্লশুলের কারণ না হয়।

দক্ষিণ কোলকাতা বয়সে নবীন, স্বাধীনতার পর থেকেই মুলতঃ এই সব অঞ্চলে বসতির ঘনত্ব বেড়েছেসেযুগে ব্যাবসা বানিজ্যর ভরকেন্দ্র কোনকালেই এদিকে ছিল না, সেজন্য পাইস হোটেলের পত্তনও বিশেষ হয় নি। কিন্তু উত্তরের মতো না হলেও দক্ষিণ একেবারে বঞ্চিত হয় নি। এ অঞ্চলেও আছে কিছু পাইস হোটেল, এবার বেরোনো তারই খোঁজে।
            
দক্ষিণ কোলকাতায় পাইস হোটেল খুঁজলে প্রথমেই যে নামটি আসবে সেটা তরুণ নিকেতন রাসবিহারী মোড় থেকে ডান দিকের ফুটপাথ ধরে গড়ি্যাহাটের দিকে পঞ্চাশ মিটার মতো এগোলেই পাওয়া যাবেফুটপাথের ভিড়ভাড়াক্কা, অসংখ্য হকারের জড়াজড়িতে গেটটা ঠাহর করা একটু মুশকিলই বটে।একটু খেয়াল রাখলেই নজরে পড়বে সরু এনট্রান্স, উপরে অবশ্য বোর্ডে নাম লেখা আছে। গেট থেকে সরু গলি ধরে এগোলেই হোটেল।

Hotel Tarun Niketan kolkata Entrance

Hotel Tarun Niketan Kolkata Main Entrance

ভিতরে একটা হলঘর মতো, মাঝখানে পার্টিশান করা, দুপাশে কাঠের চেয়ার আর মার্বেল টপের টেবিল পাতা। ঢুকেই ডানদিকে ছোট কাঠের ক্যাশ কাউন্টার। হলঘরের পিছনের দিকে হেঁশেল। 
Hotel Tarun Niketan Interior View

Hotel Tarun Niketan Kolkata Interior

সামনেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা মেনু আর মুল্য তালিকা ঝুলছে। ব্ল্যাকবোর্ডেটিতে একবার চোখ আটকাতে বাধ্য। এই হোটেলের যেটা আসল বৈশিষ্ট্য, মানে অন্য কোন পাইস হোটেলে যেটা আমি অন্ততঃ কখনো দেখিনি সেটা এখানে লেখা। পাঠক মেনু বোর্ডের ছবিটা দেখলেই বুঝবেন, এখানের বেশির ভাগ রান্নাতেই পেঁয়াজ রসুন পড়ে না। ব্যাতিক্রম শুধু বিশেষ কিছু মাছের আইটেম আর মাংস।আর মজার ব্যাপার মুল্য তালিকায় আছে কলাপাতা আর মাটির ভাঁড়। এর দামও আলাদা ভাবে ধরা। পাইস হোটেলের ঘরানা মেনেই এখানে মাছের পদের ছড়াছড়ি। প্রতিদিন অন্ততঃ আট দশ রকম মাছের পদ তৈরী হয়।রুই কাতলা থেকে ইলিশ, পার্শে, ট্যাংরা, পাবদা, বোয়াল, আড়, বাটা, কই সবই পাওয়া যায়। পাঁঠা মুরগীর মাংস মায় ডিমের কারী, সেতো আছেই। 
Hotel Tarun Niketan Kolkata Menu Board


Hotel Tarun Niketan Menu Board

ঝটপট সার্ভিস, কলাপাতায় ভাত, সঙ্গে ডাল, কড়া করে বানানো আলুভাজা, ফুলকপির ডালনা। বাটি করে করে এলো সব পদ। আমরা নিয়েছিলাম বোয়াল মাছ, আড় মাছ, ট্যাংরা মাছ আর পাঁঠার মাংস। 
Hotel Tarun Niketan Bengali Food

Hotel Tarun Niketan Bengali Food

ডালটার এতো ভালো স্বাদ তাই দিয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম। ফুলকপির ডালনাটা অতো ভালো লাগে নি, শুকনো আর কপিগুলো একটু শক্ত। বোয়াল আর আড় মাছটা ভালো ছিলো।বড় রিং পিস, ঝোলের স্বাদও ভালো, এগুলো অবশ্য পেঁয়াজ রসুন দিয়েই রান্না। 

Hotel Tarun Niketan Bengali Spread

Hotel Tarun Niketan Aar Fish

কিন্তু অসামান্য ছিলো ট্যাংরা মাছের ঝোল। বাটিতে দুপিস মাঝারি সাইজের দেশী ট্যাংরা মাছ, এটা পেঁয়াজ রসুন বিহীন, শুধু সিম, আলু আর বড়ি দিয়ে হালকা করে ঝোল।কাঁচালঙ্কার একটা হাল্কা ঝাঁঝ আছে। এককথায় অমৃত।

Hotel Tarun Niketan - Tyangra Fish

এখানে একটা মজার জিনিস দেখলাম, এখানে আলুর খুব কদর, সব মাছ বা মাংসের পদেই অনেকটা সেই সর্বঘটে কাঁঠালী কলার মতো হাজির একপিস করে বেশ বড় সাইজের আলু। এমনিতে মন্দ নয় ব্যাপারটা, তবে আমরা যেভাবে অর্ডার করেছিলাম, মানে শুধু তিন চার রকম মাছেরই পদ এবং তারপর মাংস, তাদের সবার সঙ্গে একটি করে আলু খেতে গেলে পেটেই আলুর ক্ষেত হওয়া অসম্ভব নয়।     

পাঁঠার মাংসের কথায় আসি। প্রথমেই বলে রাখি যাঁরা কষা মাংসের ভক্ত বা আশা করেন বেশ কষা গোছের খুনখারাপি লাল রঙের ঝোল হবে তাঁরা বেবাক নিরাশ হবেন। এখানে একেবারে ঘরোয়া মাংসের ঝোল, মানে বাঙ্গালীর বাড়িতে রোববার দুপুরে যা হয় আর কি। পাতলা লাল রঙের ঝোল, ওপরে সোনালী রঙের তেলের একটা হাল্কা আস্তরণ ভাসছে। দুপিস মাংস আর সঙ্গে অবশ্যই একটি বড় আলু।দেখেই মনটা কিরকম তা ধিন তা ধিন করে ওঠে। ঝাল বেশী নেই, মানে অত্যন্ত মার্জিত, নাকের জলে চোখের জলে হবার সিন নেই। তবে কাঠ বাঙ্গাল জিভে ধরতাই নাও লাগতে পারে, ঘটিরা বেশী মানিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ জিনিষ তৈরীই করা রোজের খাওয়ার কথা ভেবে। যা সপ্তাহে সাত দিন খেলেও পেট জবাব দেবে না। আর একটা ব্যাপার, আমার কাছে যে কোন ভালো পাঁঠার মাংসের পদের যেটা প্রাথমিক শর্ত, মাংস একেবারে নরম হতে হবে। শক্ত থাকবে না,যাতে রাবারের মতো দাঁত খিঁচিয়ে টানাটানি করতে হয়, আবার এমন নয় যে গলে পাঁক হয়ে যাবে।এই ব্যালান্সটাই আসল, রাঁধুনীর কেরামতি, মানে একদম নিখুঁত ম্যারিনেশান এবং সেদ্ধ হওয়া যাতে প্লাস্টিকের চামচ দিয়ে কেটে খাওয়া যেতে পারে। এব্যাপারে এখানের মাংস একেবারে দশে দশ, এক্কেবারে মাখন।  

Hotel Tarun Niketan Mutton Dish


দুজনা মিলে ভরপেট খেয়ে, ঢেঁকুর তুলে (হ্যাঁ পাইস হোটেলে আপনার ইমোশানকে দাবিয়ে রাখার দরকার নেই, টেবিল ম্যানার্স নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। সশব্দে ঢেঁকুর তোলাকে এখানে কেউ বাঁকা চোখে দেখবে না)মৌরি চিবিয়ে দেখলাম সব মিলিয়ে বিল দাঁড়িয়েছে চারশ নব্বই টাকা(কলাপাতার দাম সহ)।আমরা বক রাক্ষসের মতো খেয়েছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিল একটু উপর দিকে। তবে সাধারণ ভাবে ১৫০ – ১৮০ টাকায় পেটচুক্তি খাওয়া নেমে যাবে। মাংসের প্লেট ১০০ টাকা করে, মাছের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে, সুতরাং পকেটে সে হিসেবে বিশেষ চাপ পড়বে না।আর হ্যাঁ এখানে ওনলি ক্যাশ, নো প্লাস্টিক।

খেতে ঢুকে ব্ল্যাক বোর্ডে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন সেদিনের মেনুর ডিটেলের জন্য। যেরকম যেরকম পদ শেষ হচ্ছে ব্ল্যাক বোর্ড থেকে মুছে যাচ্ছে সাথে সাথে, এক্কেবারে রিয়েল টাইম ইনফরমেশান। যাঁরা খাবার দিচ্ছেন তাঁদেরও জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ঝড়ের বেগে তাঁরা মেনুর ফিরিস্তি দিয়ে যাবেন। আপনি দেখেশুনে ফাইনাল অর্ডার দিয়ে দিলে তিনি টেবিল নম্বর সহ হুড়হুড় করে অনেকটা শুভঙ্করী নামতা আওড়ানোর স্টাইলে সব অর্ডার আইটেম আর তার দাম একটানে বলে যাবেন আর কাউন্টারের ভদ্রলোক অসম্ভব দক্ষতায়, শর্টহ্যান্ডকেও হার মানিয়ে একই গতিতে সেটা একটা খোপ কাটা পাতায় নোট করে নেবেন। আপনার কাজ হবে খাওয়ার শেষে কাউন্টারে গিয়ে শুধু আপনার টেবিল নম্বরটা বলা। সব টেবিলের গায়েই নম্বর লেখা আছে। সেটা শুনেই কাউন্টারের ভদ্রলোক আপনাকে টোটাল অ্যামাউন্টটা বলে দেবেন, আর আপনি দাম মেটাবেনএই ব্যাপারটা বেশ মজা লাগলো আমার। খেতে খেতে মাঝে মাঝেই কানে আসছে সেই নামতা, আশেপাশের টেবিলে অর্ডার হলেই। নব্বইয়ের দশকে অঞ্জন দত্তর একটা জনপ্রিয় গান ছিলো, যার একটা লাইন বোধহয় এরকম “শুনতে কি চাও তুমি সেই অদ্ভুত বেসুরো সুর, ফিরে পেতে চাও কি সেই আনচান করা দুপুর" অনেকটা সেই কেস। এত ইন্টেরেস্টিং শোনাল যে ব্যাপারটার একটা রেকর্ডিংই করে নিলাম।


খাওয়ার পর কথা হচ্ছিল কাউন্টারে বসা ভদ্রলোকের সঙ্গে, যিনি বিল লিখছিলেন। সদাশয় মানুষটি হলেন অরুন দেবএটি ওনাদেরই পারিবারিক ব্যাবসা, উনি তৃতীয় প্রজন্ম হোটেলটি সামলাচ্ছেন। 

Hotel Tarun Niketan Arun Deb Owner

তরুণ নিকেতনের যাত্রা শুরু সেই ১৯১৫ সালে ওনার ঠাকুরদা জগৎ চন্দ্র দেবের হাত ধরে। দীর্ঘ চলার পথে খাওয়ারের কোয়ালিটিই এনাদের সবচেয়ে বড় মূলধন। পেঁয়াজ রসুণ ছাড়া রান্নার ব্যাবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। উনি জানালেন একদম শুরুর দিন থেকেই এই ট্র্যাডিশান চলে আসছে। সেকালের মানুষরা অনেকেই পেঁয়াজ রসুণ খেতেন না, তাঁদের সুবিধার জন্যই হয়ত এই ব্যাবস্থা। অমরনাথ দেব, অরুণবাবুর ছেলে জানিয়েছিলেন যে এককালে হয়ত কোন গুরুদেবের নির্দেশেই হোটেলের রান্নায় পেঁয়াজ রসুন ব্রাত্য হয়েছিলো, তবে এরও কোন প্রামাণ্য তথ্য ওনার কাছে নেই। তবে আর একটা কারণ থাকতে পারে, এটা অবশ্য নিতান্তই আমার নিজস্ব অনুমান, কালীঘাট মন্দির কাছাকাছি হওয়ার জন্য হয়ত তীর্থযাত্রীরাও এখানে আসতেন খেতে, হতে পারে সেযুগে তাঁদের একটা বড় অংশই ছিলেন নিরামিষাশী মানে যাঁরা পেঁয়াজ রসুনও ছুঁতেন না।এঁদের কথা ভেবেও এই ব্যাবস্থা চালু হতে পারে। আমদের আচারে কালীপুজোয় নিরামিষ মাংস প্রসাদ হবার চলন আছে, মানে মুলতঃ বলির পাঁঠার মাংস বিনা পেঁয়াজ রসুনে রান্না করে প্রসাদী মাংস হিসেবে খাওয়া।কালীঘাট শক্তিপীঠ, এর প্রভাব থাকতেও পারে, সঠিক জানা না গেলেও এটা এই হোটেলের একটা নিজস্ব ট্রেডমার্ক বটে।

হোটেল খুলে যায় সকাল নটায়, অত আগে অবশ্য সব কিছু রেডি হয় না। মোটামুটি বেলা বারোটা থেকে ভীড় বাড়তে থাকে। চলে প্রায় তিনটে অবধি। আবার খোলে সন্ধ্যা ৬টায়। সে সময় তড়কা রুটি, এগরোল, মোগলাই, ফ্রায়েডরাইস, চাউমিনও বিক্রি হয়। ঝাঁপ পড়ে রাত সাড়ে দশটায়।

Hotel Tarun Niketan Snacks Menu Board

হোটেল সপ্তাহের প্রতিদিনই খোলা. বছরে একটি দিন মাত্র বন্ধ থাকে, সেটি হলো দোলের দিন। সেজন্যে যেতে পারেন যে কোনো দিনই। দুপুরে গেলে ভিড় এড়ানোর জন্য একটু আগে পৌঁছনই ভালো।ঠিকানা রইলো নিচে। আমি গুগল ম্যাপে আপডেট করে দিয়েছি, যেখান থেকেই যান, ফোনে ডেস্টিনেশান সেট করলেই গুগলবাবা পৌঁছে দেবে।

হোটেল তরুণ নিকেতন।                     Hotel Tarun Niketan

৮৮/১বি, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ,              88/1B, Rashbehari Avenue
কালীঘাট মেট্রো স্টেশানের কাছে            Near Kalighat Metro Station
কোলকাতা – ৭০০ ০২৬।              Kolkata – 700 026

এই ব্লগটির সব ফোটো এবং ভিডিও তুলেছেন আমার বন্ধু এবং কোলকাতার একজন অগ্রনী ভ্রমণ লেখক ও ফোটোগ্রাফার অমিতাভ গুপ্ত। ঋণস্বীকার তাঁর কাছে।


Sunday, August 14, 2016

PICE HOTELS OF KOLKATA - JOGONMATA BHOJONALOY (জগন্মাতা ভোজনালয়)


নিখাদ বাঙালি খাবার যদি তৃপ্তি করে, মানে সোজা ভাষায় যদি কব্জি ডুবিয়ে খেতে চান আবার পকেটের ওপর বিশেষ চাপ সৃষ্টি না করেই, তাহলে কিন্তু কোলকাতার পাইস হোটেলের কোন জবাব নেই। কলকাতার ঐতিহ্য আর খাদ্য সংস্কৃতির সঙ্গে পাইস হোটেল বহুদিনে ধরে জড়িয়ে আছেআমার কাছে পাইস হোটেল মানেই পুরোণ কলকাতার গন্ধ মাখা নস্টালজিয়া, ব্ল্যাকবোর্ডে চকে লেখা মেনু, মলিন নোনা ধরা দেওয়াল, মাথার ওপর উঁচু  কড়িকাঠ লাগানো সিলিঙতে ঝোলানো অলসগতির ফ্যান, বেশ কিছুটা হৈ হট্টগোল, খাবার দেন যারা তাঁদের নামতা পড়ার মত একটানা সুরে সেদিনের মেনুর বিবরন, কাঠের টেবিলে অচেনা মানুষের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসা, টেবিলের ওপর বাটিতে নুন লঙ্কা, কলাপাতায় গরম ভাত, পাতিলেবু, নিরামিষ তথা মাছমাংসর জিভে জল আসা হরেক পদ আর বেরোনর সময় খামচা মেরে ক্যাশ কাউন্টারে বাটিতে রাখা মৌরী। এ এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা।

ইদানিং কলকাতাতে নামিদামি, মহার্ঘ্য, শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাঙালি খাওয়ার রেস্টুরেন্ট বহু খুলেছে বটে কিন্তু তাদের দাপট সামলেও কলকাতায় এখনো বেঁচে আছে পাইস হোটেলের নিজস্ব ঘরোয়া ঐতিহ্য।

ঠিক কখন থেকে যে এই পাইস হোটেলের শুরু বা ‘পাইস হোটেল’ নামটাই বা কিভাবে এল নিশ্চিত করে বলা খুব মুশকিল, এর কোন প্রামান্য ইতিহাসও আমি খুঁজে পাই নি। তবে পুরনো কলকাতার ইতিহাস আমি যেটুকু পড়েছি তাতে আমার নিজস্ব ধারণা পাইস হোটেলের শুরু এখন থেকে প্রায় দেড়শ বছর বা তারও আগে থেকে যখন কলকাতা ইংরেজদের হাতে গড়ে উঠছে ভারতবর্ষের রাজধানী শহর হিসেবে। বহু সরকারী প্রশাসনিক দপ্তর ছাড়াও হু হু করে তৈরী হচ্ছে ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেগুলির পুরোভাগে ইংরেজ্ বনিকরা ছাড়াও ছিলেন  অনেক উদ্যোগপতি বাঙ্গালী পরিবারও। দেশে ইংরেজি শিক্ষার চলও বাড়ে এই সময় থেকেই। অতএব দেশগঞ্জ থেকে বহু বাঙ্গালীর স্রোত আসা শুরু হয় কলকাতার দিকে, মূলত জীবিকা, পেশা এবং শিক্ষালাভের খোঁজে। কলকাতায় এসে পড়লেও এঁদের বেশিরভাগেরই আর্থিক সংস্থান ছিল খুবি সীমিত, করণিক বা বাবুর চাকরীতে বিশেষ অর্থ সমাগম হত না, নিজের খরচখরচা মিটিয়ে হাতে বাঁচত অতি সামান্যই, ছাত্রদের অবস্থাতো আরও খারাপ। ফলে এঁদের পরিবার পরিজন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে থেকে যেত দেশগাঁয়ের বাড়িতেই। কিন্তু একলা হলেও মাথা গোঁজার জায়গা তো চাই আবার বাড়ি ভাড়াও একার সাধ্যে কুলোবে না। অতএব এখান থেকেই জন্ম হয় মেস কালচারের। এক বাড়ীতে ছোট ছোট ঘরে চৌকি পেতে অফিসবাবু আর পড়ুয়াদের সহাবস্থান, চাঁদা করে বামুন রেখে রান্নার বন্দোবস্ত। বাজারের ভার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একেকদিন একেকজনের ওপর।এই হলো বাঙ্গালীর মেসবাড়ি। এই মেস কালচার কিন্তু বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলতে গেলে বঙ্গজীবনের অঙ্গ ছিল এবং এখনো কিছুটা বেঁচে আছে।বাকিটা ভোল বদলে হয়েছে পেয়িং গেস্ট।

ফিরে দেখলে দেখি বাংলা সাহিত্য এবং সিনেমায় মেসবাড়ির রমরমা উপস্থিতি। বহু প্রখ্যাত সাহিত্যক মায় তাঁদের সৃষ্ট চরিত্ররা পর্জন্ত মেসবাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। শিব্রাম চক্রবর্তী তো আজীবন মেসেই কাটিয়ে গেলেনআবার মেসবাসী ঘনাদা বা প্রথম যৌবনের ব্যোমকেশকে কি ভোলা যায়? মেস বাড়ির রঙ্গ নিয়ে তৈরী হয়েছে বহু দমফাটা হাসির গল্প আর বাংলা সিনেমাও। যাই হোক প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে মেসবাড়ি নিয়ে কচকচির কারণ একটাই, পাইস হোটেলের উত্থানের পিছনে এই মেসবাসী বাঙ্গালিদের একটা বিশেষ অবদান আছে। মেসের দৈনন্দিন জোলো আলুনিমার্কা খাবার খেয়ে গ্রাম বা মফঃস্বল থেকে আসা মানুষগুলো বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়তেন। সুদুর গ্রামে মা, ঠাকুমা বা স্ত্রীর হাতের রান্নার জন্য এঁদের প্রান ব্যাকুল হয়ে উঠত। ঠিক এখান থেকেই অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর ব্যাবস্থা হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে পাইস হোটেলগুলি। স্বল্প পয়সায় সুস্বাদু এবং নিখাদ বাঙ্গালী রান্নার স্বাদ বাড়ির খাওয়া না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও হয়ত উপশম করত।

পাইস কথাটার উতপত্তি নিয়েও বিতর্ক আছে। শোনা যায় সস্তা বা কম পয়সার হোটেল থেকে অপভ্রংশে ‘পাইস’ কথাটা আসে।যদিও এর কোন ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য আমি হাজির করতে পারব না। এটা শুধুই অনুমান।ইংরেজ আমলে পয়সা ছিল পাইস, এই মেট্রিক যুগের হিসেবের সঙ্গে মিল নেই। পয়সার পর আনার হিসেব, তাতে দাঁড়ালো চার পয়সায় এক আনা, আর ষোল আনায় এক টাকা। কিন্তু সেই যুগে পয়সার দাম ছিল, এক পয়সায় জুটত ভাত ডাল তরকারির পেটচুক্তি খাওয়া। সেই থেকেই হয়ত লোক মুখে পাইস হোটেল কথাটা চালু

এই ভাবেই পথ চলা শুরু কলকাতার অধিকাংশ পুরনো পাইস হোটেলগুলির। শতবর্ষ পেরিয়ে এখনো  কলকাতার বুকে কিছু পাইস হোটেল তাদের ঐতিহ্য ধরে টিঁকে আছে, কিছু হারিয়ে গেছে কালের নিয়মে। এগুলির বেশির ভাগেরই খোঁজ পাওয়া যাবে উত্তর বা মধ্য কলকাতায়। প্রাচীনত্বে দক্ষিণ কলকাতা বহু পিছিয়ে সেজন্য দক্ষিণে এদের সংখ্যা মুষ্টিমেয় এবং যা আছে সবগুলিই বয়েসে অপেক্ষাকৃত নবীন। 

আমি নিজে একজন পাইস হোটেলের ভক্ত। কাজেকর্মে টো টো করে ঘোরার সুবাদে অনেক পাইস হোটেলেই খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সবকটিই যে ভালো তা বলব না।মুষ্টিমেয় কিছু হোটেল এখনো নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে গুণমানের সঙ্গে কোন আপস করে নি আবার কিছু হোটেলের খাবার মোটামুটি চলনসই থেকে একেবারে বাজে, সবই আছে। তবে আমি দেখেছি যে কটি শতবর্ষ পার করা প্রতিষ্ঠান আছে সবগুলিই অনবদ্য

এমনিই এক হোটেল জগন্মাতা ভোজনালয়। এখানে আগে যাওয়ার সুযোগ আমার হয় নি। যদিও ইচ্ছেটা মনের মধ্যে ছিলই। সেদিন দুপুরে একটা কাজে যেতে হয়েছিল গিরিশ পার্ক, কাজ শেষ হলো তাড়াতাড়িই, অতএব হাতে রইলো বেশ কিছুটা সময় আর সময়টাও দুপুর একটা।এখান থেকে কৈলাস বোসে স্ট্রীট প্রায় হাঁটা পথ। বিবেকানন্দ রোড ধরে এসে, বিধান সরনীর মোড় থেকে শ্রীমানি মার্কেটের দিকে একটু এগোলেই বাঁহাতি রাস্তা। বর্ষার দুপুর, একটু আগেই ঝেঁপে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, একটা গাড়ীবারান্দার নিছে দার্ড়িয়ে মাথা বাঁচালাম।বৃষ্টি একটু ধরতেই হাঁটা শুরু। হাওয়ায় ভেজা গন্ধ, বৃষ্টিভেজা কংক্রিটের রাস্তা ভাপ ছাড়ছে, পুরনো বাড়ীগুলোর ফাঁকে ফাঁকে অযত্নে বেড়ে ওঠা মলিন গাছগুলও এখন সতেজইতস্তত জমা জল, ভিজে ট্রাম্ লাইন চকচক করছে।চারদিকে আলিস্যি ভাব, শহরটা যেন আড়মোড়া ভাঙ্গছে।বাসরাস্তা ছেড়ে কৈলাস বোস স্ট্রীট ধরে কয়েক পা হাঁটতেই সাইনবোর্ডটা নজরে এল। একটি জীর্ণ, সরু লম্বাটে গড়নের দোতলা বাড়ীর গায়ে লাগানো।বাহারি নয়, টিনের ওপর হাতে রঙ করা, আর একটি ফ্লেক্স। লেখা জগন্মাতা ভোজনালয়, বাংলা, ইংরেজীর সঙ্গে ওডিয়া ভাষাতেওবোঝা গেলো প্রতিষ্ঠাতা আদতে উৎকল নিবাসী।


বাড়ির গায়েই বাঁদিকের সরু গলি দিয়ে গিয়ে ভিতরে ঢোকার দরজা, বাড়িটির গড়ন অনেকটা যেন রেল গাড়ির কামরার মতো, পরপর তিনটি ঘর ঢুকেই যেটি প্রথম ঘর সেখানে সামনেই ছোট্ট কাঠের ক্যাশ কাঊন্টার, পিছনের দেওয়ালে বাংলা ক্যালেন্ডারে মালক্ষীর বড় ছবি। তার দুপাশে ফ্রেমবন্দী দুই বৃদ্ধর বহু পুরনো সাদাকালো ছবি, শুকনো গাঁদা ফুলের মালা ঝুলছে। পাশেই চোখ টেনে নেবে একটা বড় খুনখারাপি লাল রঙের মেনূ বোর্ড, সাদা খোপে ফেল্ট পেন দিয়ে লেখা দাম। ব্ল্যাকবোর্ডেরই একটু আধুনিক রূপ আর কি। তাতে রকমারী মাছের পদেরই আধিক্য। রুই, কাতলা থেকে শুরু করে ইলিশ, বাটা, ট্যাংরা, চিংড়ী, পার্শে, কই, মাগুর, পমফ্রেট, পাবদা, চিতল, শোল, মায় কাঁকড়াও আছে।  


এই ঘরেই কাঠের টেবিল চেয়ার পেতে খাওয়ার বন্দোবস্ত। মলিন নোনা ধরা দেওয়ালে অচিন সব দেশের ম্যাপ। উঁচু কড়িবরগার সিলিং থেকে ঝুলছে মন্থরগতির ফ্যান। 


তার পিছনের ঘরটি অবশ্য ফাঁকা, টেবিল চেয়ারের  বালাই নেই, সেখানে একদম মাটিতে চাটাই পেতে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে খেতে পারেন। কিছুদিন আগে পর্যন্তও প্রথম ঘরটিতে একই ব্যাবস্থা ছিল কিন্তু কালের নিয়মে পালটেছে বা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন এনারা। 


শেষ ঘরটি, হেঁশেল, যথারীতি আধো অন্ধকার, মসীবর্ণ দেওয়াল,কয়লার উনুন আর প্রমাণ সাইজের হাঁড়ীকড়ার সমাহার।  



হেঁশেলে এবং পরিবেশনায় যারা আছেন, অধিকাংশই উৎকলবাসী,সবাই ট্রেডমার্ক লাল চেক গামছা এবং গেঞ্জি শোভিত। এতে উৎসাহিত হবার কারণ আছে অবশ্যইবহু কাল ধরেই বাঙ্গালীর বারো মাসে তেরো পার্বন, অন্নপ্রাশন, পৈতে, বিবাহ মায় শ্রাদ্ধতে যে বিপুল খাওয়াদাওয়ার আয়োজন তার নেপথ্য শিল্পীরা কিন্তু এই উৎকলবাসীরাই। এঁদের রক্তে আছে রান্না। অনেক যুগ পেরিয়েও আজকালকার বহু নামিদামী ক্যাটারারদেরও প্রানভোমরা হলেন এই মানুষগুলোই।

বর্ষার দুপুরে ভিড় বিশেষ নেই, বসার জায়গা পেতে অসুবিধা হল না। মাটিতে বসার দিকে যাইনি, শহুরে হাঁটু বিদ্রোহ করবে।টেবিল চেয়ারই ভালো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই চলে এলো কাঁসার থালার উপর কলাপাতায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, তার উপর বাটিতে বসানো ডাল আর ডাঁটার সব্জি, আমের চাটনি, পেঁয়াজ আর পাতিলেবুমাটির ভাঁড়ে জল। এটা শুরু, তারপর আমিষ মেনু আপনার মর্জিমতো। বর্ষার দুপুরে মাছের পদ দিব্বি জমবে, সুতরাং ঢেলে অর্ডার দেওয়া হলো চার রকমের মাছের পদ, ট্যাংরা আর চিংড়ী মাছের ঝাল,তার সাথে পার্শে আর কাতলা মাছের পেটি ভাজা। সব মাছেরই দারুন সাইজ, বড়ো সাইজের দিম ভরা ট্যাংরা মাছ, পেঁয়াজ দেওয়া পাতলা ঝোল সহ, দুটো বেশ বড় সাইজের চিংড়ির ঝাল। পাঠককে বরং বলি এই সময় লেখাটা ছেড়ে ছবিগুলোতে নজর দিন, বেশ একটা আন্দাজ পাবেন। মাছ ভাজাও দারুন, স্বাদেই বোঝা যায় মাল একদম ফ্রেশ। সব রান্নাই খুব সুস্বাদু। সবচেয়ে বড় কথা তেল মশলার কোন আধিক্য নেই কিন্ত স্বাদে কোনও খামতি নেই। পাইস হোটেলের মুল লক্ষ্যই ছিল মানুষকে বাড়ির রান্নার স্বাদ দেওয়া এবং রোজকার খদ্দেরও যাতে অম্ল বা পিত্তশুলে না ভোগেন সেটা নিশ্চিত করা। সেদিক থেকে দেখতে গেলে জগন্মাতা ভোজনালয় ১০০ তে ১০০, সেই ট্রাডিশান সযত্নে পালন করা হচ্ছে





খুব যত্ন করে খাওলালেন এঁরা। আমার মতো যারা আশির দশক বাঁ তারও আগে বাঙ্গালীর বিয়ে বাড়ীতে খেয়েছেন, তাঁরা হয়ত কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন। তখন বাড়িতেই ঠাকুর এনে রান্না হত, ভিয়েনও বসত। পরিবেশনের কোন কোট এবং হাতে গ্লাভস পরা কেটারিং এর লোক থাকত না, পাড়ার উৎসাহী ছেলেরাই সে দ্বায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়ে নিত। তাতে পেশাদ্বারিত্তের কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আন্তরিকতার অভাব কোনদিনও ছিল না।  

উপরিউক্ত পদগুলির জন্য মুল্য পড়ল, সাকুল্যে ৪৪০ টাকা। এটাকে মুল্য বলার চেয়ে সন্মান দক্ষিণা বলা বরং মনে হয় বেশি উপযুক্ত।

কাউন্টারে বসা ভদ্রলোক গম্ভীর প্রকৃতির এবং কিছুটা মিতভাষী। আমাদের অকুন্ঠ প্রশংসা শুনে অবশেষে গোঁফের ফাঁকে হাল্কা হাসির রেখা ফুটল। নাম গঙ্গাধর মিশ্র। ওনার থেকেই জানা গেল প্রতিষ্ঠানটির বয়স একশ পেরিয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠা্র সালটি তিনি ঠিক বলতে পারলেন না। ঊডিষ্যা থেকে এক সুদুর অতীতে এক যুবক ভাগ্যান্বেষণে এসে পড়েছিলেন এই কোলকাতা শহরে, নাম বিকলচন্দ্র দাস। সম্বল ছিল শুদু হাতের অসাধারণ রান্না। সেই বিদ্যা কাজে লাগিয়েই পথ চলা শুরু জগন্মাতা ভোজনালয়ের। এঁরই ফোটো ঝুলছে কাউন্টেরের পিছনে। এখন মালিকানা তৃতীয় প্রজন্মের হাতেরান্নার ভার এখন ওডিয়া রাঁধুনিদের হাতেই, তাঁরাই এখনও ম্যাজিক দেখিয়ে চলেছেন। গুনমানের সঙ্গে কোন আপস নেই, সেই পুরোন রীতি অক্ষুন্ন রেখেই খদ্দের আপ্পায়নের বন্দোবস্ত।


বিগত দিনের হেঁশেলের নিয়ম মেনে এখানে আজও মুরগীর মাংস আর ডিমের প্রবেশ নিষেধ। শুধু পাঁঠার মাংস হয় কিন্তু বৃহস্পতিবার ছাড়া। সুতরাং মাংসবিলাসীরা ক্যালেন্ডার দেখে যাবেন। মাছের পদের রমরমা সবদিনই। আর রুটি কিন্তু পাওয়া যায় না, শুধুই ভাতের বন্দোবস্ত।

খোলার সময় প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টে। আবার সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ১১টা অবধি চলে অতিথি আপ্যায়নের পালা।          

ঠিকানাঃ
জগন্মাতা ভোজনালয়
৪০,কৈলাস বোস স্ট্রীট,
কলকাতা – ৭০০ ০০৬,

আমার কাহিনীটা এখানেই শেষ হতে পারত কিন্তু একটু উপসংহার আছে সেটা বলার লোভ সামলাতে পারছি না।


কৈলাস বোস স্ট্রীট থেকে বেরিয়ে বিধান সরনীতে উঠলেই, রাস্তার উল্টোদিকে কপিলা আশ্রম, আরেকটি শতবর্ষের পুরোন শরবতের দোকান। দোলের দিন এদের বিখ্যাত ভাং শরবতের বিপুল চাহিদা। আমরা যখন পৌঁছলাম তখন অলস দুপুরে দোকান খদ্দেরবিহীন, ভিতরে আলো আঁধারীতে একজন মানুষ ঝিমোচ্ছেন। জিজ্ঞেস করতে জানা গেলো শুধু কেশর মালাই শরবৎ পাওয়া যাবে। তাইই সই, নইলে ব্যাপারটার একটা মধুরেণ সমাপয়েত হচ্ছিল না। 



ত্রিশ টাকা গ্লাস। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কাঁচা সোনা রঙের সেই অমৃত তৈরী হলো। ফেনা ওঠা, মালাই মারা। খেয়ে মন খুশি করে আবার হাঁটা। 

ঠিকানাঃ
কপিলা আশ্রম
২০৪/২, বিধান সরনী,
কোলকাতা – ৭০০ ০০৬
শ্রীমানি মার্কেটের পাশে।


এবার একটু এগিয়েই বিবেকানন্দ রোডের ক্রসিং এ বিখ্যাত পানের দোকান।

খাইকে পান বনারসওলা...


PICE HOTELS OF KOLKATA - JAGANNATH BHOJONALOY (জগন্নাথ ভোজনালয়)


আজ ছিলো 'জগার' দিন.....

জগাটা আবার কে? আহা জগা হলো গিয়ে আদরের ডাক নাম.... জগার গুনমুগ্ধরা তাঁকে আদর করে এই নামেই ডেকে থাকেন ....

একটা ভালো নাম তো আছেই,... জগন্নাথ,....পুরো বললে 'জগন্নাথ ভোজনালয়'..... হ্যা ঠিক ধরেছেন,....এই জগন্নাথকে পাবার জন্য পুরীধাম দৌড়োনোর প্রয়োজন নেই, এটি ঘরের কাছেই, কলকাতার একটি বিশিষ্ট পাইস হোটেল। বিগত প্রায় ষাট বছরের ওপর ভোজনবিলাসী জনগণেশের সেবায় নিয়োজিত।

এনার অধিষ্ঠান এস এন ব্যানার্জী রোডে, টাইমস অফ ইন্ডিয়া অফিসের ঠিক পাশে।


তা আজ গিয়েছিলাম,...জগন্নাথ দর্শন করে এবং বলাই বাহুল্য পেটপুজো দিয়ে মনে যারপরনাই আনন্দ নিয়ে ফিরেছি।
এখানে মাছের পদগুলি অতি উৎকৃষ্ট এবং মৎস্যরসিকরা এখানে এলে অভিভূত হবেন। আজ টেবিলে বসে তলব করলাম পার্শে এবং বোয়াল মাছ,... আড়ে দীঘে বেশ বড় পার্শে মাছ এবং মানানসই আকারের বোয়াল মাছ পাতে পড়ল। মুখে দিয়েই বোঝা গেলো অত্যন্ত সুস্বাদু এবং ফ্রেশ মাছ। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোন যেতেই পারে যে আধিকারিকরা গুণমান নিয়ে আপোষ করেন না।


এছাড়াও নিয়েছিলাম এদের একটি বিশেষ পদ যার নাম দেওয়া হয়েছে "রুই মাছের কবিরাজী ঝোল"। সাধারনতঃ মাছের কবিরাজী শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে তেলে ভাজা ঝুরি ঝুরি ডিমের খোলসে একটি সুপুষ্ট মাছের টুকরো যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিত্র কাফে, দিলখুশা, বসন্ত কেবিন বা আপনজনের মতো বাঘা বাঘা নাম। এই বস্তুটি কিন্তু তার ধার কাছ দিয়েও হাঁটে না। এটি হলো ফুলকপি, আলু, কাঁচকলা এবং পেঁপে দিয়ে বানানো রুই মাছের পাতলা ঝোল। গুরুপাক খেয়ে খেয়ে আপনার পেটের অবস্থা যদি পটলডাঙ্গার প্যালারামের মতো হয় তাহলে আপনার জন্য এই পদটি আদর্শ। পটল দিয়ে সিঙ্গি মাছের ঝোলের তুলনায় এর গুন কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। নামের উৎস কি তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে, আমি জিগ্যেস করার সুযোগও পাইনি, কিন্তু আমার নিজের ধারণা, আগেকার দিনে অম্লশুলের রুগীদের জন্য বোধহয় কবিরাজরা এই রকম ঝোল খাবার নিদান দিতেন। তার থেকেই বোধহয় এই নামটা দেওয়া।

পাঁঠার মাংসটা আমার খুব একটা সুবিধার লাগলো না। ঝোলটার স্বাদ ভালো হলেও মাংসের টুকরো গুলো সুসিদ্ধ ছিল না ফলে খেতে যথেষ্ট অসুবিধা হয়েছিল। জগার ঠেকে মাছেরই জয়জয়াকার, মাংশাসীরা অতটা খুশী হতে পারবেন না।

আর একটা ছোটো দুঃখ থেকে গিয়েছিল,....তা হলো মেনুতে চাটনী এবং পাঁপরের কোনো স্থান নেই।

খাবারের দাম অত্যন্ত পকেট সহায়ক, অল্প পয়সাতে পেটচুক্তি খাওয়া। নিরামিষ থালি পাওয়া যায় তিরিশ টাকাতে,.... মেনু বোর্ডে পরিস্কার লেখা আছে জগন্নাথ ভোজনালয় তিরিশ টাকার নিচে আপনাকে খাওয়াতে অপারগ। সুতরাং ঢুকতে হলে আপনাকে নুন্যতম তিরিশ টাকা পকেটে রাখতেই হবে।

ওই এলাকাতে দুপুরবেলাতে গেলে ছোট করে একবার ঢু মারতেই পারেন। তবে এই অধমের একটা ছোট্ট উপদেশ হলো যেতে হলে একটু আগে আগে পৌছনই ভালো, তা ধরুন বেলা একটার মধ্যে হলে সবচেয়ে ভালো হয়। নইলে ভিড় বাড়ে। ওই যে একটা শ্যামা সঙ্গীত আছে না.

"আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি,
আমি অনাহুত একজন অনেক দোষে দোষী।"

দেরী করলে আপনার অবস্থা ওই রকম হওয়া বিচিত্র নয়..

অতএব পা চালিয়ে,.......

ঠিকানাঃ
১০৫/৮, সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী রোড
কোলকাতা – ৭০০ ০১৪
টাইমস অফ ইন্ডিয়া অফিসের ঠিক পাশে।