Tuesday, May 16, 2017

অন্য সুন্দরবনের গল্প

Samshernagar and Jhingekhali Forest Range:Sundarban

Jhigekhali Watch Tower and Forest Range Sundarban

মনটা পালাই পালাই করছিল বহুদিন ধরেই কিন্তু নানারকম চাপে ব্যাপারটা আর হয়েই উঠছিলনা। মানে এবারের সুন্দরবন যাত্রাটা। সুন্দরবন আমি গেছি বহুবারই, জলে জঙ্গলে বাদাবনে ঘোরাঘুরি কম হয় নি, কিন্তু এবারের আকর্ষণ ছিলো কিছুটা অন্য।সজনেখালি, সুধন্যখালি, দোবাঁকির চেনা পথ ছেড়ে এবার উত্তর চব্বিশ পরগণার বাংলাদেশ ঘেঁষা অচেনা জঙ্গলের স্বাদ নেওয়া। জঙ্গল এখানে তুলনামুলক ভাবে অনাঘ্রাত, সাধারণ সার্কিটগুলোর মতো এখনো অত ট্যুরিস্টলাঞ্ছিত নয়। 

আমার এই দিকের জঙ্গলের প্রেমে পড়া ধীমানের হাত ধরে, ফেসবুকে যে আছে ‘সুন্দরী সুন্দরবন’ নামে। ধীমান এই এলাকারই ছেলে।বাড়ি হেমনগর কোস্টাল থানার পাটঘরা গ্রামে। সুন্দরবনকে ও নিজের হাতের তালুর মতই চেনে। ধীমানের ফেসবুকের দেওয়ালে অসংখ্য মনকাড়া ছবি দেখেই সুন্দরবনের এই অঞ্চলটার সঙ্গে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠা। ওর প্রোফাইলেই আমার দেখা শুরু প্রত্যন্ত এই অঞ্চলের জীবন্ত জলছবি। বাদাবন,বন্যপ্রাণ আর তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষগুলির জীবনের গল্প উঠে আসে ধীমানের ক্যামেরায় আর লেখনীতে। সর্দারপাড়া ফেরিঘাট, কাটোয়াঝুরি আর ঝিঙেখালির জঙ্গল, আদিবাসিপল্লি, গ্রামজীবনের রোজনামচা, ভাটিয়ালী গান আর মোরগলড়াই এর কাহিনী এসেছে ফিরে ফিরে।ক্যামেরার মুন্সিয়ানা তো আছেই এছাড়া ধীমানের লেখার হাতটিও ভারী মিষ্টি, এক অনাবিল সরলতা আর বাদাবনের সোঁদা গন্ধ মাখানো থাকে তাতে।

এই লেখা আর ছবির টানেই যাওয়ার ইচ্ছেটা তৈরী হচ্ছিল, ধীমানও বহুবারই বলেছে চলে আসার জন্য, ইচ্ছে ও নিজে সঙ্গে করে আমাকে সুন্দরবন চেনাবে। এরপর যখন ও জানালো ওর স্বপ্নের বাগান বাড়ি ‘প্রসূন’ প্রস্তুতির পথে তখন গিয়ে পৌঁছানটা ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

আমি দেখেছি আমার জীবনে প্ল্যান প্রোগ্রাম করে বিশেষ কিছু কোন দিনই করে দেখাতে পারিনি, ওই হুট করে যকে বলে ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ গোছের ব্যাপার না হলে আমার আর ঘর ছেড়ে বেরনো হয়ে ওঠে না। সুতরাং এবারো তাই, বন্ধু সুমিত বলল যাবে আর প্রায় একদিনের নোটিসে বেরিয়ে পড়া। সুমিতের মতলব অন্য, সে ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফার, সে চলেছে পাখপাখালির খোঁজে, সঙ্গে মহার্ঘ্য ক্যামেরা আর তার সাথে হাউইটজার কামানের মতো দেখতে লেন্স।সামশেরনগরের নদীর আশেপাশে নাকি পাখির মেলা বসে।সেগুলিকে ক্যামেরাবন্দি করা সুমিতের লক্ষ্য।আমার এই ভুতটা অত মাথায় চাপেনি, আমি চলেছি গ্রাম আর তার মানুষগুলোকে দেখতে। হাতে সময় মোটে একদিন, মানে পুরো চব্বিশ ঘন্টাও নয় কিন্ত তাই সই, যেতে তো হবেই।

বাইকবাহনে যাত্রা শুরু, ইএম বাইপাস থেকে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে ঘটকপুকুর, মিনাখাঁ হয়ে সোজা মালঞ্চ। সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরে ইছামতি নদীর তীরে টাকী ছুঁয়ে হাসনাবাদ।এদিন আকাশের মুখ সকাল থেকেই গোমড়া।আগের দিনই ঝকঝকে রোদ ছিল আর শেষ জানুয়ারীর ঠান্ডার আমেজ।কিন্তু এদিন হঠাৎ পুরো উলটো, সকাল থেকেই মেঘের দাপট, বাসন্তী রোডে উঠতেই শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি। কিন্তু কিছু করার নেই, বেরিয়ে যখন পড়েছি। সুমিতের কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগটা শুধু সামলে রাখার দায়। শহর ছাড়িয়ে একটু এগোতেই দুপাশে সবুজের বন্যা, কখনও বা দিগন্ত বিস্তৃত ভেড়ি, রাস্তার দুপাশে গাছের চাঁদোয়া। মাঝে মাঝে ছোট ছোট জনপদ, বাজার পেরিয়ে যাচ্ছি।কিছুক্ষনের মধ্যেই টাকীকে পাশে ফেলে হাসনাবাদ, এখান থেকে নদীর ওপর ফেরি পেরিয়ে চলে যাব উল্টো দিকে পারহাসনাবাদ।সেখান থেকে আবার হাসনাবাদ হিঙ্গলগঞ্জ রোড ধরে হিঙ্গলগঞ্জ পার করে সোজা লেবুখালি। সেখানে দ্বিতীয় বারের মতো ফেরি পার।ওপারে দুলদুলি হেমনগর রোড ধরে যোগেশগঞ্জ বাজার।সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে সর্দারপাড়া ফেরিঘাটের দিকে কিছুটা গেলেই পাটঘরা গ্রাম, আমাদের গন্তব্য।

কিছুটা ভিজে আর বেশ কিছু কাদা মেখে হাসনাবাদের ঘাটে পৌঁছে খোঁজ করলাম বার্জের, মোটরসাইকেল নিয়ে পার হতে হবে।কিন্ত কোথায় বার্জ, সেতো উল্টো দিকের ঘাটে ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে, এপারে আসার নামই নেই আর আমরাও দাঁড়িয়ে আছি। মধ্যে তিনটে সিগারেট শেষ, সুমিত বোর হয়ে ব্যাগ থেকে ওর গোদা ক্যামেরা বের করে নদীর তীরে কাদায় চরে বেড়ানো পাখির ছবি তুলতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। দেখাদেখি হাম কিসিসে কম নেহি বলে আমিও আমার পুঁচকে ক্যামেরা তাক করে ছবি তুলতে লাগলাম।কাদা ঘেঁটে বেড়ানো পাখিগুলোর একটা নাকি ‘কমন স্যান্ডপাইপার’ আর অন্য লম্বা ঠ্যাংওয়ালা পাখিটাকে বলে ‘লং টোড স্টিন্ট’। এসব সুমিতের থেকে ঝাড়া বিদ্যে, এ ব্যাপারে আমার নিজের ফান্ডা শুন্য। আমার তো একটাকে দেখে সেই টেনিদার বলা কুরুবকের মতো লাগলো, আর অন্যটা নিশ্চই কাদাখোঁচা।সেই ছবিগুলোই পোস্টিয়ে দিলাম।
Samshernagar Sundarban Hasnabad Ferry Ghat
Hasnabad Ferry Ghat

Long Toed Stint Bird at Samshernagar Sundarban
Long Toed Stint, Samshernagar, Sundarban :Photo Courtsey - Sumit Biswas
কিন্তু দুঃসংবাদটা শুনলাম একটু পরেই, বার্জ নাকি ওপারে যথেষ্ট সংখ্যায় গাড়ি না পেলে এপাশে ভিড়বে না, তাতে নাকি তার লস, আর কখন যে সে ভর্তি হবে সে বলা ভগবানেরও অসাধ্য।অতএব বিকল্প কি না দেশী নৌকায় বাইক পার। গেলাম অন্য ঘাটে, কিন্তু সেখানে ব্যাবস্থাপনা দেখে চক্ষু চড়কগাছ।কংক্রিটের ভাঙ্গা ঘাট ধাপে ধাপে নেমে গেছে, ভাটার টানে নদীর জল অনেকটা নীচে, আর নৌকার ডগাটা শুধু ঠেকে আছে ঘাটের ধাপের সঙ্গে।এর মধ্যেই প্রায় ট্র্যাপিজের খেলা দেখিয়ে হ্যান্ডেলবার ধরে নিজেকে এবং মোটরসাইকেলকে ব্যালান্স করে নৌকায় নামতে হবে। একজন লোক আছে শুধু পিছন থেকে বাইকটাকে ধরে রাখার জন্য, কিন্তু নামাতে গিয়ে হড়কে একটু বেসামাল হলেই হয় বাইক সুদ্ধু জলে অথবা ঘাটের কংক্রিটের ধাপে লেগে হাড়গোড় ভাঙ্গবে, বাইকেরও বারোটা বাজবে।আবার গোদের ওপর বিষোঁড়ার মতো বৃষ্টির জন্য ঘাটের ধাপগুলো পিছল। যাই হোক হৃৎপিণ্ড প্রায় মুখে এনে, দুবার হড়কে, প্রায় ফেলে দিতে দিতে মাঝিদের থেকে যথেচ্ছ ঝাড় খেয়ে নিজেকে আর বাইককে তো কোনরকমে নামালাম। কিন্তু ওপারে গিয়ে আবার রিপিট টেলিকাস্ট, বাইক ঘাটে তুলতে গিয়ে। এতেও মুক্তি নেই, ঘাট থেকে ডাঙ্গায় উঠতে অনেক ধাপ খাড়াই সিঁড়ি চড়তে হয়। সিড়ির মাঝখানে একটা সরু কংক্রিটের র‍্যাম্প করা আছে, ঠিক বাইকের চাকার মাপে, সেখানে বাইকটাকে সোজা করে ধরে রেখে, ইঞ্জিন চালিয়ে গিয়ারে ফেলে ধীরে ধীরে ওঠাতে হয় আর নিজেকে পাশে পাশে হ্যান্ডেলবার ধরে ব্যালান্স করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হবে।সে এক বিষম কঠিন ব্যাপার। বিশদে আর না গিয়ে বলছি, লেবুখালির জেটিতেও বার্জ পাইনি অতএব একই ঘটনা ঘটেছিল। 
Ferry Crossing Hasnabad Ghat
Crossing on a country boat - Hasnabad Ferry Ghat
এই দুটো ঘাট পেরোতেই যা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, তা ছাড়া বাকি জার্নিটা ভারী সুন্দর ছিল, ভীষণ আনন্দ করে গেছি চারপাশ দুচোখ ভরে দেখতে দেখতে। বৃষ্টিটাও শেষের দিকে ধরে গিয়েছিলো।যোগেশগঞ্জ বাজারে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা প্রায় দেড়টা। 

সেখান থেকে আবার ডানদিকে যে রাস্তা চলে গেছে সর্দারপাড়া ফেরিঘাট সেই রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়েই ছবির মতো গ্রাম পাটঘরা।সেখানেই ধীমানের সাধের বাগানবাড়ী “প্রসূণ”।সেটিই ছিলো আমাদের একরাতের আস্তানা।

গ্রামটি একবার দেখলেই মনে ধরার মতো। ধীমান জায়গাটি বেছেছে দিব্যি।পাকা রাস্তা থেকে নেমে ইঁটবিছানো পথ চলে গিয়েছে গ্রামের মধ্যে দিয়ে। দুপাশে মাটির বাড়ি, খড়ের চালা,বেড়ার ধারে ফুলের গাছ, নিকোন উঠোন, সেখানেই বাচ্চাদের হুড়োহুড়ি, মেয়েরা সব ঘরকন্নার কাজে ব্যাস্ত, দড়িতে শুকোচ্ছে রংবেরঙ্গের শাড়ী,জামাকাপড়। কোথাও একধারে মাটির চুলোতে হাঁড়ি চড়েছে, ভেসে আসছে রান্নার সুবাস,আঙিনার এককোণে উপছে পড়া ধানের মরাই, আবার কোথাও চলছে মাঠ থেকে সদ্য কেটে আনা ধান ঝাড়াই, পুরুষ মহিলা সবাই হাত লাগিয়েছে সমান তালে।সোনারঙ্গা খড় কেটে গোড়া বেঁধে চলছে নতুন করে ঘর ছাওয়ার কাজ।গোয়ালে গরুরাও ভাগ পেয়েছে খড়ের, জাবর কাটছে তারা।ছোট ছোট পুকুরে হাঁসের দল। এক্কেবারে যেন জলরঙে আঁকা ছবি। তবে দেখে বোঝা যায় প্রত্যন্ত অঞ্চল হলেও গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণূ।প্রায় প্রতিটি মাটির বাড়ীর খড়ের চালে উঁকি মারছে ডিশ অ্যান্টেনা।ইলেকট্রিসিটির সমস্যা নেই,রাত্রে দেখেছিলাম প্রায় সব বাড়ীর জানলা দিয়েই এলইডি বাল্বের আলোর ছটা।
Patghara Village Samshernagar Sundarban
Patghara Village

Patghara Village Samshernagar Sundarban
A small kid comes out to play Patghara Village
সর্দারপাড়া ফেরীঘাট হলো এই অঞ্চলের এক গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। নদীমাতৃক সুন্দরবনের যাতায়াত, পরিবহন সবই কিন্তু নদী বেয়ে, এখানে বোটই ভরসা মানে লাইফলাইন যাকে বলে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থা বহুক্ষেত্রেই অপ্রতুল এবং সময়সাপেক্ষ। মোটরসাইকেলে আসার সময়ই আমরা কিছুটা টের পেয়েছি। যোগেশগঞ্জ বাজারের প্রায় সব মালপত্রই নৌকা চে্পে আসে ধামাখালি, হিঙ্গলগঞ্জ, ক্যানিং বা আরও বহু দুরদুর জায়গা থেকে।সর্দারপাড়া ঘাটে তাই দিনভর ব্যাস্ততা আর হাঁকাহাঁকি, ঠিক যেন আমাদের বড়বাজার। শুধু তফাৎ হলো লরীর বদলে বোট থেকে মাল বোঝাই হচ্ছে বা খালাস হচ্ছে, লোক যাতায়াতও চলছে, বাসের মতোই ঠেসে লোক উঠছে বোটে।
Sardarpara Ferry Ghat Samshernagar Sundarban
A busy day at Sardarpara Ferry Ghat
এবার একটা ইন্টেরেস্টিং ব্যাপার আছে, এই সর্দারপাড়া নামটা নিয়েই। ধীমানের কাছ থেকেই খানিকটা শোনা। কিছু্টা আশ্চর্যজনক ভাবেই এই অঞ্চলটি আদিবাসী অধ্যুষিত। আদিবাসিদের বলা হয় সর্দার আর তার থেকেই সর্দারপাড়া নাম, মানে সর্দারদের পাড়া আর কি। বহু বছর ধরেই আদিবাসীরা এই অঞ্চলের বাসিন্দা, হয়ত কয়েক প্রজন্ম আগে ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে এদের পুর্বপুরুষরা এসে ঘাঁটি গেড়েছিলেন এখানে। কিন্তু অতদিন আগে ছোটনাগপুরের পাহাড় জঙ্গল ছেড়ে এই বাদাবনে, যেখানে জলে কুমীর আর ডাঙ্গায় বাঘ সেখানে কেনই বা কি উদ্দেশ্য নিয়ে যে এঁরা এসে পড়েছিলেন সেটা গবেষণার বিষয় হতেই পারে। কিন্তু এই মানুষগুলি এখানে ঘর বাঁধার পর বহু বছর ধরে এঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর লোকাচার বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির পাশাপাশি বয়ে যেতে থাকে। এখানে কেউ কারুর স্বতন্ত্রতা না হারিয়েও এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরী হয়ে গেছে। তাই ভাটিয়ালির পাশাপাশি এ অঞ্চলে শোনা যায় ধামসা মাদলের বোল, বনবিবির পালা আর ঝুমুর গানের সঙ্গে মিশে যায় টুসুগানের সুর।নবান্ন উৎসবের উদ্দীপনায় লাগে বাঁধনা পরবের রঙ, আর আসর বসে মোরগ লড়াইয়ের।

ইচ্ছা ছিলো এই মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ জমানোর আর জানার চেষ্টা কিসের টানে তাদের পুর্বপুরুষরা এসেছিলেন পাহাড় আর শাল পিয়ালের জঙ্গল ছেড়ে নদীঘেরা এই বাদাবনের দেশে।ধীমান আশ্বাসও দিয়েছিলো নিয়ে যাবে কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালো সময়টাই। তাই এটাও তোলা রইল পরেরবারের জন্য।

“প্রসুণ” কিন্তু আমাদের মুগ্ধ করেছে। একবিঘার ওপর জমিতে যেন অচিনপুরের  বাড়ী। গেট পেরিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে দুটি ঘর, আর একটি সবে গড়ে উঠছে, ডানদিকে একটা মঞ্চ।পিছনে একটি পুকুর আর তার পরেই ধীমানের নিজের হাতে গড়ে তোলা শাল আর ইউক্যালিপ্টাসের বন। ফনফন করে বাড়ছে গাছ। সামনের মাটির ঘরে খড়ের চালা, কিন্তু ভিতরে আরামদায়ক বন্দোবস্ত। বড় ঘর, দুটি করে ডাবল বেড,এক এক ঘরে চারজন আরামসে হাতপা ছড়িয়ে থাকার মত। বাথরুমে কমোড, বেসিন সবই মজুদ, মায় ঘরে এলইডি টিভি পর্যন্ত। যদিও সেটা চালানোর কোন তাগিদ বোধ করি নি।
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Homestay Prosun at Patghara Village
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Homestay Prosun at Patghara Village
এতো গেল নেহাতই ইঁট কাঠ আর উদ্ভিদের গল্প। কিন্ত আসল যেটা পেয়ে মন ভরে গেছে আর যেটার গভীরতা মাপার সাহস বা ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই সেটা হল আতিথ্যের উষ্ণতা।আমাদের থাকার প্রতিটি মুহুর্তের খেয়াল যেভাবে ধীমান এবং তার সঙ্গীরা রেখেছে, বিশেষ করে ধীমানের ছায়াসঙ্গী পচা, তাতে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করার ইচ্ছা আমার নেই। পচা আর তার বন্ধুরা যেভাবে প্রবল উৎসাহ নিয়ে আমাদের সঙ্গে জলে জঙ্গলে, হেঁটে, ইঞ্জিন ভ্যানে আর নৌকায় টৈ টৈ করেছে, ঝিঙেখালির জঙ্গল আর সামশেরনগর চিনিয়েছে তা অনবদ্য।

আর পেটুক মানুষের আসল কথাটা না বললেই নয়। এই দুইদিনে যে হারে পেটপুজো করেছি তাতে আমি নিশ্চিত কম করে তিন কেজি ওজন বৃদ্ধি করে এসেছি (এবং সেটা দস্তুরমতো বেশ অনেক পথ হাঁটাহাঁটি করার পরও)। আমি আর সুমিত দুজনের খাওয়ার বহর বকরাক্ষসের ঈর্ষার কারণ হতে পারত। আর হবে নাই বা কেন, প্রথমদিন দুপুরে শুরুই হলো গরম ডাল, ভাতের সঙ্গে দেশী মুরগীর ঝোল আর বাগদা চিংড়ীর মালাইকারী দিয়ে। সন্ধ্যেবেলা জলযোগ সদ্য ধরা ভেটকি আর আমুদি মাছ ভাজা আর রাত্রে হাঁসের মাংস। পরের দিন দুপুরে আবার কাঁকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত।  গীতাদি মানে গীতা বৈদ্য, যিনি রেঁধেছিলেন আমাদের জন্য এই দুদিন, উনি যে উঁচুদরের শিল্পী এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই, হাতে যাদু আছে। কাঠের আঁচে এই রান্না বহুদিন মুখে লেগে থাকবে। এই আনন্দ বোঝানোর জন্য আমার ভাষায় কুলোবে না, টেনিদার স্মরণ নিতেই হবে, মানে একেবারে যাকে বলে ডিলা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস, ইয়াক ইয়াক।
Homestay Prosun Patghara Village Samshernagar Sundarban
Gita Baidya the culinary artist at work 
এর পরে রয়ে গেলো ঝিঙ্গেখালি জঙ্গল আর সামশেরনগরের গল্প। 

পৌঁছানোর পর কব্জি তো দুরের কথা, আমি আর সুমিত প্রায় কনুই পর্যন্ত ডুবিয়ে দুপুরবেলা খেয়েছি। তারপর দুজনের অবস্থা হল সদ্য আস্ত হরিণ গেলা অজগরের মতো। শরীর বিছানা চাইছে, কিন্তু হাতে সময় বড় কম, যা পারি দেখে নিতে হবে সন্ধ্যে হবার আগেই। কাল শুধু সকালটা পাব, দুপুরবেলাতেই ফেরার পথ ধরতে হবে। অতএব দাঁত মুখ খিঁচিয়ে, মনের জোরকে প্রায় শেষ সীমায় নিয়ে গিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আজকের গন্তব্য ঝিঙ্গেখালির জঙ্গল আর ওয়াচটাওয়ার। সঙ্গে চললো ধীমানের বিশ্বস্ত লেফটেন্যান্ট পচা, আমাদের গাইড হয়ে। তখন বৃষ্টিটা সবে ধরেছে, শীতের বিকেলের মরা আলো বেরিয়েছে। এবার আমরা সওয়ারী ইঞ্জিন ভ্যানে। ঝকঝক আওয়াজ করতে করতে, চীনে ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে, গ্রামের পথ বেয়ে চললো আমাদের বাহন। পাটঘরা গ্রাম ছাড়িয়ে পাঁচ ছ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যোগেশগঞ্জ বাজার, আমরা এসেছিলাম এই পথ ধরেই। যোগেশগঞ্জ চৌমাথা থেকে সোজা রাস্তা গেছে কালীতলা বাজার। আমাদের গন্তব্য সেখানেই। কালীতলা বাজারে যখন নামলাম দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। মেঘ প্রায় কেটে গেছে বলে সুর্যদেব উঁকি মারতে শুরু করেছেন। 

কালীতলা বেশ জমজমাট বাজার, দোকানপাট, বাজার বসেছে, সব্জি থেকে মাছ সবরকমেরই, লোকজনের হাঁকাহাঁকিতে সরগরম। নেমেই দৌড়লাম ফেরিঘাটে। ভারী মজার জায়গা, এপাশে এতো মানুষের ভীড়, আলো, হইহল্লা, কিন্তু নদীর ওপারে সুন্দরবনের ঘনসবুজ গম্ভীর গা ছমছম করা জঙ্গল।একটা সরু নদীর এপার আরে ওপারের মধ্যে কি আশ্চর্য বৈপরিত্য। ঘাটে দাঁড়িয়েই দেখলাম, ওপারের জঙ্গল নাইলনের জাল দিয়ে ঘেরা। সুন্দরবনের এই অঞ্চলেই বোধহয় বাঘে আর মানুষের এতো কাছাকাছি সহাবস্থান। আমাদের মতো শহরের লোকের পক্ষে কল্পনা করা মুশকিল অষ্টপ্রহর কি বিপদের সঙ্গে এই অঞ্চলে মানুষ ঘর করেন।বাড়ির পাশেই সাক্ষাৎ দক্ষিণ রায়ের আস্তানা।নাইলনের জালে বাঘ আটকায় কিনা কে জানে, আমার তো দেখে কিছুই ভরসা হলও না। প্রায়ই বাঘ বেরোনর খবর আসে।প্রতি বছর মৃত্যুও ঘটে, সরকারী খাতায় সেগুলো শুধু পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যায়। 

ঘাটে ইতিউতি কিছু নৌকা বাঁধা, দুটো ছোট মোটর লঞ্চ। সামনে নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে সেটা পেরোলেই ঝিঙ্গেখালি ওয়াচটাওয়ারের ঘাট, মেরে কেটে দশ মিনিটের নৌকা যাত্রা। কিন্তু একি কান্ড, কেউই দেখি নিয়ে যেতে রাজি নয়। কেন, নাকি আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি, পৌঁছতে পৌঁছতে টাইম পেরিয়ে যাবে। আর তার পরে ঝিঙ্গেখালি ঘাটে নৌকা ভিড়লে বনবাবুরা গোঁসা হবেন, আর আইন না মানার ফাইনও নাকি আছে। অতএব সব্বাই একযোগে ঘাড় বেঁকিয়ে বসে।অনুরোধ উপরোধেও চিঁড়ে ভিজলো না।তীরে এসে তরী ডোবার এটাই বোধহয় আদর্শ উদাহরণ। পচার মুখটাও একটু শুকনো, আমাদের দুই শহুরে প্রানীকে এতদূর ঠেঙ্গিয়ে নিয়ে এসে জঙ্গলের দোরগোড়া থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সেটা ওরও ঠিক হজম হচ্ছে না। তারপর সুমিতের কাঁধে বোম্বা লেন্স, ছবি শিকারের জন্য তৈরি কিন্তু বিধি বাম বলেই মনে হচ্ছে। অতএব অগতির গতি হিসাবে পচা আবার ঘাট থেকেই ফোনে ধরল ধীমানকে। দুচার কথা বলেই বললো দাদাকে বলেছি কথা বলতে, একটু দাঁড়ান। আমরাও নেই কাজ তো খই ভাজ বলে ইতিউতি হযবরল ছবি তুলতে লাগলাম, এমনকি সেলফি অবধি। পাঁচ মিনিট পরেই ধীমানের ফোন পচার মোবাইলে, ব্যাবস্থা নাকি হয়ে গেছে, জঙ্গলে নামা যাবে। এবার পচা বীর দর্পে ঘাটে নেমে মাঝিদের বলল ছাড়ো নৌকা সব কথাবার্তা হয়ে গেছে, লাইন ক্লিয়ার। মাঝিদের ধন্ধ তবুও যায় না, ঝোপ বুঝে কোপ হিসেবে ভাড়া হাঁকলো দুশো টাকা।দশ মিনিটের যাত্রার জন্য যা অবশ্যই গলাকাটা। কিন্তু উপায় নেই দায়টা আমাদেরই। সেইজন্য ফাঁদে পড়ে বগা কান্দে রে করে দুশোটি টাকাই কবুল করা গেলো। নৌকায় উঠতেই ঝপ করে আর একজন মাঝবয়সি মানুষ উঠে পড়লেন, জানলাম উনি গাইড, জঙ্গলের পথে এনার উপস্থিতি নাকি মাস্ট। 
Jhingekhali Forest Range and Watch Tower Kalitala Ferry Ghat
Kalitala Ferryghat

Jhingekhali Watch Tower and Forest Range Kalitala Ferry Ghat
Kalitala Ferry Ghat
শুরু হলো নৌকাযাত্রা, বাঁক ঘুরতেই, সহসা দশগুণ হয়ে গেলো নদীর বিস্তার, একদিকে ঝিঙ্গেখালির গভীর জঙ্গল, অন্যদিকে বহুদুরে আবছা ধুসর তটরেখা। ওদিকটা বাংলাদেশ, সেদিকেও ঘন জঙ্গলের আভাস। বেশ কিছুটা তফাতে অলস গতিতে ভেসে যাচ্ছে বাংলা দেশের পতাকা লাগানো একটা জাহাজ।পশ্চিম আকাশে তখন সুর্যাস্তের খুনখারাপী রঙের হোলি খেলা। দুচোখ ভরে দেখছি শুধু।এর মধ্যেই নৌকা ঝিঙ্গেখালি ঘাটে। কিন্তু অবস্থা দেখে চক্ষু চড়কগাছ, নামবো কিভাবে? ভাঁটার টানে জল নেমে গেছে আর তীর জুড়ে থকথকে কাদা, জেটিতে ওঠার আগেই হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডূবে মরব। আমরা কাদা ঘাঁটতে রাজী নই, অতএব উপায়? দেখা গেল আর একটা বোট ভীড়েছে জেটিতে, তার নাকটা ঘাটের সিঁড়িতে ঠেকানো। আমদের মাঝিভাই অনেক চেষ্টা চরিত্র করে, নিজে জলে কাদায় নেমে, নিজের বোটকে নানা কসরতে অন্য বোটটার গায়ে ঠেকিয়ে দিলেন।আমরা ক্যামেরা, জলের বোতল সামলে, হাঁচর পাঁচড় করে ব্যালান্সের খেলা দেখিয়ে অন্য বোটটা পেরিয়ে অবশেষে ডাঙ্গায় পা রাখলাম। নেমে নিজেদের পুরো কলম্বাস মনে হল।
Jhingekhali Watch Tower and Forest Range sundarban
On the way to Jhingekhali watch tower Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
The vast expanse of river Raimangal near Jhingekhali Forest Range Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
View  of  Jhingekhali Forest Range Sundarban
Jhingekhali Forest Range and watch tower Sundarban
The Ferry Ghat at Jhingekhali Watch Tower Sundarban
ঘাট থেকে উঠেই বনদপ্তরের বিশাল কম্পাউন্ড,বাহারী ফুলের গাছ, কেয়ারী করা বাগান, একটা পুকুর আর শেষ প্রান্তে তিনতলা ওয়াচটাওয়ার। একজন বনকর্মী জানালেন আমরা অলরেডী লেট, অতএব সময় বরাদ্দ ঠিক দশ মিনিট। তাই সই, কারণ তখন প্রায় অন্ধকার নেমে এসেছে, কিছু দেখতে পাওয়ার আসাও ক্ষীন।উঠলাম ওয়াচ টাওয়ারে, সামনে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিপুল বিস্তার। সামনে একটা জলাশয়। তার পিছনে বেশ কিছুটা জঙ্গল পরিস্কার করা, বন্যপ্রানীরা জল খেতে এলে যাতে ওয়াচ টাওয়ার থেকে নজরে আসে। বহু পাখীর ডাক শোনা যাচ্ছে, জঙ্গলে দ্রুত নেমে আসছে অন্ধকার। দুরবীন দিয়ে ইতিউতি দেখার চেষ্টা করলাম, নজরে এলো না কিছুই, এদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে, সুতরাং ক্যামেরা বাইনোকুলার গুটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। আপসোস বিশেষ নেই, এই মায়াবী বিকেলে সুন্দরবনের যে ভাবগম্ভীর রূপ দেখলাম, মস্তিষ্কের হার্ড ডিস্কে সেভ হয়ে থাকবে চিরকাল। 
Jhingekhali Forest and watch tower sundarban
View from Jhingekhali Watch Tower Sundarban
ফেরার পথে কালীতলা বাজারে চা খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে আমাদের তিনচাকার যন্ত্রবাহনে আবার পাটঘরার পথে। সন্ধ্যেবেলা নাকি আমুদি মাছ আর ভেটকি মাছ ভাজার বন্দোবস্ত। আর ডিনারে হাঁসের মাংস আর ভাত। জয়গুরু।

পরের দিন সকালে অভিযান শেষপ্রান্ত সামশেরনগরে। 

সামশেরনগর নিয়ে কিছু কিছু লেখা পড়েছিলাম কয়েকটি ভ্রমণ বিষয়ক পত্রপত্রিকায়। সেসব বর্নণা শুনেই ঠিক করেছিলাম এখানে আসবোই।

দ্বিতীয় দিন আলো ফুটতেই বেরিয়ে পড়লাম।আমরা সওয়ারি তিন চাকার ইঞ্জিন ভ্যানে। ধীমানের বাড়ি থেকে সামশেরনগর ঘন্টাখানেকের পথ। চা খেয়ে উঠে পড়া গেল আর সারথি স্টার্ট দিলেন। ডিসেম্বরের শেষে হাওয়ায় ঠান্ডার কামড়। প্রথমে পড়ে কালীতলা বাজার। গতকাল এখান থেকেই বোটে করে গিয়েছিলাম ঝিঙ্গেখালির জঙ্গলে।এবারে ভ্যান কালীতলা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল সামশেরনগরের পথে। বাজার ছাড়ালেই ফাঁকা রাস্তা। রাস্তাটা ভারি সুন্দর, ডানপাশে একটা খাল আমাদের সঙ্গী হয়েছে। খালের ঠিক ওপারেই ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল।পাড়ে কাদায় অসংখ্য শ্বাসমুল মাথা তুলে আছে। কাদায় ঘুরে বেড়াচ্ছে দুধসাদা বকের দল। ইঞ্জিনভ্যানের একঘেয়ে ঝক ঝক আওয়াজ ছাপিয়ে জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে অজানা পাখিদের কলকাকলি।পুরো রাস্তাতেই আমাদের সঙ্গী এই খালটা। আমাদের বাঁদিকটা ফাঁকা, ফাকা বেশীরভাগটাই মাঠ আর চাষের জমি। কখনওবা পেরিয়ে যাচ্ছি ছোট ছোট গ্রাম আর জনবসতি, মাটির ঘর, ছোট দোকান, মাঝে চোখে পড়ল একটা বনবিবির থান। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
View on the way to Samshernagar Sundarban
Bonbibi Temple Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Bonbibi Temple Samshernagar Sundarban
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই সামশেরনগর। কালিন্দী আর রায়মঙ্গল নদী দিয়ে ঘেরা ভারত ভুখন্ডের প্রায় শেষ প্রান্ত। কালিন্দী নদীর প্রান্তে জিরো পয়েন্ট থেকে ঝাপসা নজরে আসে বাংলাদেশের সীমানা। সীমান্ত অঞ্চল হওয়ার জন্য অবশ্যই স্পর্শকাতর এলাকা, বি এস এফের বিরাট ক্যাম্প রয়েছে আর নদীর ধারে উচুঁ ওয়াচটাওয়ার।হিসেবমত সামশেরনগরের জনবসতি অনেক পুরোন, আসার পথে পড়ল সামশেরনগর স্কুল, দেখলাম দেওয়ালে সিমেন্ট দিয়ে প্রতিষ্ঠা সন দেওয়া আছে ১৯৫৮। তার মানে এর অনেক আগে থেকেই এখানে মানুষের বসবাস।চিন্তা করার চেষ্টা করলাম সেই সময় সামশেরনগরের রূপ ঠিক কেমন হতে পারে, জঙ্গল তখন নিশ্চয়ই ছিল আরও ঘন, আরও ভয়ঙ্কর, বাঘের আনাগোনাও ছিল অনেক বেশী।আর বাঘ আটকানোর জাল তো এই হালে লেগেছে। তার মানে সেই কোন কাল থেকেই এই দুর্গম বাদাবনে জলে কুমীর আর ডাঙ্গায় বাঘ নিয়ে মানুষের জীবনসংগ্রাম শুরু।

এখনও সামশেরনগরের মজা এটাই, জঙ্গল আর লোকবসতি এখানে পাশাপাশি, প্রায় হাত ধরাধরি করে, মাঝখানে ব্যাবধান বলতে শুধু শকুনখালি নদী। তাও তাকে নদী বললে বেশী বলা হয়, খাল বলাই ভালো। চওড়ায় হয়ত মেরেকেটে হাত ত্রিশেক। ওপারেই গা ছমছমে গভীর ম্যানগ্রোভ অরন্য, এত ঘন যে ভরা দিনের আলোতেও দৃষ্টি চলে না ভিতরে।বনদপ্তর থেকে পুরোটা ঘিরে রেখেছে নাইলনের জালে যাতে বাঘ টপকে এপারে আসতে না পারে।কখনও কখনও গভীর রাতে মাটির ঘরে শুয়ে থাকা মানুষের আচমকা ঘুম ভাঙ্গে ওপারের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা বাঘের গম্ভীর ডাকে। এই বন্য পরিবেশে, রাতের অন্ধকারে, পলকা মাটির ঘরে শুয়ে সে ডাক যে শুনেছে সেই জানে শুধু সেই আওয়াজেই কিরকম ভাবে রক্ত জল হয়ে যায়।কখনো বা গ্রামের পথে ভিজে কাদা মাটিতে দেখা যায় তাঁর পায়ের ছাপ, শুধু নাইলনের জাল কি ঠেকিয়ে রাখতে পারে বনের রাজাকে। 

যতই হোক না ভয়ঙ্কর, এই জঙ্গলকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার মানুষগুলির জীবন। সবারই দিন গুজরান হয় সারাদিন নদীতে মাছ, কাঁকড়া ধরে বা জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করে। সুন্দরবনের এই অঞ্চলে চাষবাস বিশেষ কিছু হয়ই না, পেটের ভাত জোগায় এই জঙ্গলই আবার হামেশাই এই জঙ্গলই কেড়ে নেয় বহু প্রাণ। যেহেতু জীবন এখানে এত জঙ্গলকেন্দ্রিক, তাই হয়ত বাঘে মানুষে মোলাকাতের সংখ্যাও এখানে বেশ বেশি। তাই মাঝে মাঝেই প্রিয় মানুষটি জঙ্গলে গিয়ে আর ফেরে না, কুঁড়েঘরে ওঠে কান্নার রোল। হতভাগ্য মানুষটির সঙ্গীরা নিঃশব্দে গ্রামে ফিরে আসে মাথা নিচু করে, কখনোবা আধখাওয়া ছিন্নভিন্ন দেহটা কাপড়ে জড়িয়ে।খুব অল্প কিছু সৌভাগ্যবানই জীবিত ফেরে, সাক্ষাৎ মৃত্যুকে চোখের সামনে দেখে।কোনক্রমে প্রাণটা নিয়ে ফিরলেও যমে মানুষে টানাটানির পর শরীরে গভীর ক্ষতের দাগ আর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় বাকিটা জীবন।কিন্তু কোন মৃত্যুই এখানে জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারে না। জীবন এখানে কঠিন, দারিদ্র নির্মম, তাই শোকের সময়ও এখানে সীমিত। চোখের জল মুছে মৃতের নিকটজনকে আবার সেই জঙ্গলেই ফিরতে হয় পেটের দায়ে, প্রাণ হাতে করে।

সামশেরনগর দেখতে গেলে একমাত্র উপায় হচ্ছে হাঁটা। পৌঁছে আমরা ভ্যান ছেড়ে দিলাম। চালক এখানেই আমাদের ফেরার অপেক্ষায় থাকবেন। আমরা গঞ্জের মধ্যে অল্প হাঁটা পথ বেয়ে শকুনখালি নদীর ধারে উঁচু মাটির বাঁধে এসে উঠলাম। এবার শকুনখালির তীর ধরে বাঁধের ওপর দিয়ে সোজা হাঁটা।সামশেরনগরকে চিনে নেওয়া এভাবেই। হাঁটাপথে আমাদের বাঁদিকে গ্রাম্যজীবনের চলমান ছবি।কোথাও মাটির ঘরে আঙ্গিনাতে চলছে ধান ঝাড়া, কোথাওবা চলছে জাল বোনা। কোনে ডাঁই করা খড়ের আঁটি।মাদুর পেতে বাচ্চারা বসেছে পড়তে, কয়েকজন আবার হুটোপাটি করে বেড়াচ্ছে। তারে শুকোচ্ছে রংবেরঙের শাড়ী, জামাকাপড়, মাটির উনুনে আঁচ পড়েছে, হাঁড়িতে ফুটছে ভাত।দাওয়াতে বৃদ্ধ,বৃদ্ধারা চাদর মুড়ি দিয়ে রোদ পোহাচ্ছেন। ওদিকে শকুনখালির তীর জুড়েও ব্যাস্ততা। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় চলেছে মাছ ধরা, কিছু নৌকা লেগেছে উল্টোপারে জালছাওয়া জঙ্গল ঘেঁষে।বড্ড যেন কাছে। দেখে একটু শিহরণ বোধ হয় আর কি, এমনকি এই পরিষ্কার দিনের আলোতেও।মনে হয় যেকোন সময় জঙ্গল ফুঁড়ে দেখা দিতে পারেন দক্ষিণরায়। আমরা তো দাঁড়িয়ে আছি তাঁর সাম্রাজ্যেই।এখানের এই গা ছমছমে ভাবটাই একটা দারূন অভিজ্ঞতা। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
The path beside river Shakunkhali, samshernagar, Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life at Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Kids Studying Samshernagar Sundarban
খালে নৌকার ঝাঁক তো আছেই,  কেউ কেউ তীরে দাঁড়িয়েই হাতজাল ফেলে মাছ ধরছে। বেশ কিছু মহিলা দেখলাম কোমর জলে নেমে জাল জাতীয় জিনিস নিয়ে জল ঠেলে হাঁটছেন। জিজ্ঞাস করতে জানা গেল কাঁকড়া ধরা চলছে। এখানে দেখে বুঝলাম স্ত্রী, পুরুষ ভেদাভেদ নেই, বাইরের কাজে সবাই হাত লাগিয়েছে। নৌকাতে ছেলেদের সঙ্গে মহিলারাও আছেন, দাঁড় বাওয়া থেকে জাল ফেলা সবেতেই, আবার ঘরকন্নার কাজেও। 
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Fisherman Samshernagar Sundarban
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Fishermen on boat at the backdrop of the forest
Samshernagar Sundarban tourism and home stay
Life goes on at Smshernagar Sundarban
শীতের সকালে এই হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছে। দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি, শকুনখালির ধারে ধারে গাছে পাখির মেলা। হাঁটতে হাঁটতেই নজরে পড়ল দারুণ সুন্দর নীল রঙের ভার্ডিটার ফ্লাইক্যাচার, ডানায় ঝিলিক তোলা পার্পল সানবার্ড, স্মল মিনিভেট আর অবশ্য করেই নানারকমের রংবাহারী মাছরাঙা পাখি। কতরকম নাম তাদের, কমন কিংফিশার, কলার্ড কিংফিশার, ব্ল্যাক ক্যাপড কিংফিশার।নদীর জলে পোঁতা বাঁশের খুঁটির ওপর তারা বসে আছে আর থেকে থেকেই তীব্র গতিতে জলে ঝাঁপ দিয়ে ঠোঁটে মাছ নিয়ে উঠে আসছে।
Birds of samshernagar sundarban tourism
Stock Billed Kingfisher, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
White Collared Kingfisher Birds of samshernagar sundarban tourism
White Collared Kingfisher, Samshernagar, Sundarban :Photo courtesy Sumit Biswas
White Breasted Kingfisher Birds of samshernagar sundarban tourism
White Breasted Kingfisher, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
Small Minivet Birds of samshernagar sundarban tourism
Small Minivet, Samshernagar, Sundarban : Photo courtesy Sumit Biswas
Verditer Flycatcher Birds of samshernagar sundarban tourism
Verditer Flycatcher, Samshernagar, Sundarban :Photo Courtesy Sumit Biswas
Small Minivet Birds of samshernagar sundarban tourism
Small Minivet, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
Purple Sunbird Male Birds of samshernagar sundarban tourism
Purple Sunbird Male, Samshernagar, Sundarban: Photo Courtesy Sumit Biswas

Verditer Flycatcher Birds of samshernagar sundarban tourism
Verditer Flycatcher, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
Long Toed Stint Birds of samshernagar sundarban tourism
Long Toed Stint, Samshernagar, Sundarban : Photo Courtesy Sumit Biswas
এছাড়াও আরও কতশত পাখির মেলা, আমি অবশ্য এত পাখি চিনিও না বরং এ ব্যাপারে বেশ অজ্ঞ।বন্ধু সুমিতের ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফির শখ, সে কিছু কিছু পাখী চেনালো আর বেশির ভাগ সময়টাই তার কামানের মতো লেন্স উঁচিয়ে ঊর্ধমুখ হয়ে ঝপাঝপ ছবি তুলতে লাগলো। আমার এই বাতিক অতোটা নেই, অতএব আমি নিজের মনে ঘুরতে লাগলাম ইতিউতি। এই করতে গিয়েই চোখে পড়ল, একটা উঁচু গাছের ডালে একটা ভুতুম প্যাঁচা অত্যন্ত গম্ভীর আর বিরক্ত মুখে আমাকে দেখছে। ছবি তুলতে গেলাম কিন্তু সে আমার পুঁচকে ক্যামেরার রেঞ্জের অনেক বাইরে। তবে ব্যাপার স্যাপার দেখে বুঝলাম এই জায়গাটা পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ। পাখিরোগ থাকলে ক্যামেরা দুরবীন বাগিয়ে চলে আসতে পারেন, নিরাশ হবেন না বলতে পারি।
Birds of samshernagar sundarban tourism
Photo Courtesy Sumit Biswas
হাঁটতে হাঁটতে এবারে শকুনখালির শেষ প্রান্তে, যেখানে সে মিশেছে কালিন্দীর সঙ্গে। মোহনায় বিশাল চওড়া কালিন্দী। দুপুরের রোদে নদীর বুকে তখন লক্ষ হীরের ঝিলমিল। দূরে নদীর বুকে অসংখ্য মাছধরা ট্রেলারের ধুসর অবয়ব দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে  হু হু করে, বাঁকের মুখে ঢেউয়ের ঝাপট আটকানোর জন্য ইঁটের বাঁধানো পাড়। তার ওপর বসলাম একটুক্ষণ, অনেকটা হাঁটা হয়েছে, আবার ফিরতে হবে একই রাস্তা ধরে। নদীর ধারে জাস্ট চুপ করে বসে থাকতে আমার বরাবরই ভালো লাগে, এখানেও তার ব্যাতিক্রম নয়। নদীর ওপারে বাংলাদেশের সুন্দরবন, চলে গেছে আরও পুর্বদিকে। জঙ্গল সেখানে আরও ঘন আরও বিশাল তার বিস্তার। পৃথিবীর সর্ব্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে জানতে হলে, এর বৈচিত্রকে বুঝতে হলে আরও অনেক অনেক সময় লাগবে। তাই আবার ইচ্ছা রইলো ফিরে আসার। 
Samshernagar Sundarban Tourism Homestay
View of river Kalindi from zero point: Samshernagar Sundarban
এবারের মতো যাত্রা শেষ। এবার ঘরে ফেরার পালা।

সঙ্গে স্মৃতি হিসাবে থাকল কিছু ছবি। সেগুলোর কয়েকটা দিলাম এখানে। না কোন ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফী নয়, আমার দেখা নিতান্ত সাধারণ কিছু গ্রাম জীবনের টুকরো মুহুর্ত।

সুন্দরবনকে একটু অন্যভাবে দেখতে গেলে, অনুভব করতে গেলে আসতে পারেন এদিকে। যদিও আমি প্রথাগত ভাবে জঙ্গলে ঢুকিনি কিন্তু তার ব্যাবস্থাও আছে ধীমানের কাছে। চেনা  ট্যুরিস্ট সার্কিটের বাইরে সুন্দরবনের এই অঞ্চলে এলে জঙ্গলের এক অন্য রূপ দেখতে পাবেন।থাকবে অচেনা অজানা নদীতে খাঁড়িপথে নিজের মতো ঘোরাঘুরির আর জঙ্গলকে অনুভব করার সুযোগ।সজনেখালি, সুধন্যখালির হুড়োহুড়ি, লঞ্চভর্তি মানুষের হইহল্লা, যাঁরা সুন্দরবনের সম্মন্ধে কিছুমাত্র না জেনেই শুধু ফুর্তি করতে এসেছেন, সেইসব উতপাৎ এখানে নেই। আর হ্যাঁ খালি বাঘ দেখাকে পাখির চোখ করে আসবেন না, তাতে সুন্দরবনের অসামান্য সৌন্দর্য তো কিছুমাত্র উপভোগ করতে পারবেনই না উলটে একরাশ হতাশা নিয়ে বাড়ী যাবেন। মনে রাখবেন এটা রণথম্ভোর বা তাড়োবার জঙ্গল নয়। আপনার ইচ্ছায় নয়, সুন্দরবনের বাঘ তার ইচ্ছায় আপনাকে দেখা দেবে।সেইটা মেনে নিয়ে যদি আসেন আর প্রকৃতিকে ভালোবাসার সংবেদনশীল মনটা যদি থাকে, নিরাশ হবেন না।

এখানে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই কয়েকটা মানুষের কথা যাদের আন্তরিক সাহায্য, ভালোবাসা আর পরিশ্রম না থাকলে এই ছোট্ট বেড়ানোটা এত মনগ্রাহী হত না।এদের কেউই পেশাদার গাইড, ট্যুর ম্যানেজার বা হোটেল ব্যাবসায়ী নয়, কিন্তু যে আন্তরিকতা, ভালবাসা আর যত্নের সঙ্গে আমাদের ঘুরিয়ে দেখিয়েছে, ২৪ ঘন্টা আমাদের সব সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রেখেছে এক কথায় অনবদ্য। পয়সা দিয়ে কেনা পেশাদারী আথিথেয়তার সঙ্গে এর কোন তুলনাই হয় না। পচা,তরুণ, পাপ্পু, ভোলা, কমবয়সী ছেলে সব, কিন্তু কি অসম্ভব করিৎকর্মা, আর জঙ্গল চেনানোর কি আন্তরিক প্রচেষ্টা।

থাকা আর ঘোরার বন্দোবস্তের জন্য যোগাযোগ করুন ধীমানের সঙ্গে। ঠিকানা নিচে দেওয়া রইলো।

ধীমান মন্ডল।
প্রসূণ, গ্রাম পাটঘরা
থানা হেমনগর কোস্টাল
হিঙ্গলগঞ্জ, উত্তর চব্বিশ পরগনা।
৯০৮৮০৩০৫৮৬/৯৫৪৭১৭১০০/ ৯০০৭৩৩৬৩৫৩

Sunday, April 2, 2017

RANKINI TEMPLE NEAR JADUGUDA TOWN JHARKHAND

Rankini Temple near Galudih, Jharkhand is situated amidst very scenic landscape. You can be here for religious reasons or just to soak in the beauty of nature.

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
Devotees queuing up for Puja at Rankini Temple near Jaduguda

Rankini Temple (Temple of Rankini Mata) is situated on the Hata-Musabani state highway about three kilometers ahead of the mining town of Jaduguda in Jharkhand.

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
Road leading to Rankini temple
Rankini Mata is worshiped as a form of Devi Durga. This is one of the ancient and important pilgrimage sites of the East Singhbhum district of Jharkhand. However I found very little information about the history and origin of this temple. There is another temple of Rankini Mata at the nearby town of Ghatshila. It is believed that King of Dhalbhumgarh, Raja Jagannath Dhal had founded the temple of Rankini Mata. I am not sure if this is the same Raja Jagannath Dhal, who came to throne after the reigning king of the same family was attacked & defeated by the British Army led by John Fergusson in 1767, and finally estranged to Midnapore in West Bengal. Jagannath Dhal was also removed from throne later as he was unable to pay Rs.55,000/- yearly to British. Probably during this fiasco, the temple was shifted to Ghatshila town but the old temple at Jaduguda still remains. 

Another story says that in ancient times the deity was founded by a local tribal man when he apparently noticed a bejeweled little girl disappearing in the forest. The same night Devi appeared in his dreams and directed him to set up the temple and start worshiping. There are tells but I did not find any concrete reference to establish as to when this temple was set up and by whom.

The current temple that stands is about 60 years old built around 1950 or later. The trust managing the temple was formed in 1954. Since it is fairly modern structure, no intricate stone curving or any other work of architectural or design excellence can be found. It’s a fairly simple structure and I could only see the gross cement bass relief work done in gaudy colours of various idols, with prominence of Durga on the main temple and the shikhara. Right over the main entrance there is a large bass relief work of Devi Durga with her four children in Mahishasura slaying avatar as is commonly seen at the pandals in Bengal during the Puja. On top of this, a panel depicts the various avatars of lord Shiva, as is the custom. The door pillars at both sides are adorned with ten avatars (Dashavatara) of Vishnu. Inside the sanctum there is no deity but a black stone that is worshiped as Devi Durga. The priests traditionally are all from Bhumij cast from nearby village of Sahada.

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
The main entrance of Rankini Temple
I would tend to believe the stone deity was originally worshiped by the local tribes, but later, through the passage of time transformed into Hindu Goddess Durga, probably when the Kings of Dhalbhumgarh took over. There is also this story that human sacrifices were once offered regularly on a stone slab, which was believed to be sacred and the seat of the deity. It is also said that the British intervened sometime during the year 1865 and stopped the ritual.   

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand

The whole day the temple is abuzz with devotees. People queue up to offer Puja right since morning from 6 PM when the temple gate opens up. The temple is right on the highway, the superstructure rising almost from the shoulder of the road leaving no space between the road and the temple. The devotees queue up on the narrow single lane highway. Being a mining area this road sees heavy movement of truck traffic. There is a huge queue everyday in midst of this and adding to the chaos people freely wander around and crowed up to buy puja items from makeshift shops on the other side of the road. I found the whole situation pretty precarious and a mishap is waiting to happen any time. I wonder if the authorities have any plans to make the place safer by at least widening and barricading the road.

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
The highway in front. Vehicles passing dangerously close to people in front of the temple

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
Ladies adorned in brightly coloured sarees wait their turn to offer puja
I am not a religious person by any means but what I liked is the abundant scenic beauty of the place. The hills, forests and the undulating landscape makes up the typical beauty, Jharkhand is famous for. There is a small hillock on the opposite side of the Rankini temple, housing a small Hanuman temple on the top. The hilltop offers a breathtaking panoramic view of the surrounding landscape.

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
The hillock opposite Rankini temple housing the Hanuman Mandir on top
Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
Closer view of the peak.

A drive along the highway offers beautiful scenic beauty of the surrounding Dalma hill range. Just keep driving along the highway and you will see the undulating countryside and the blue hills on the horizon. 

Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
Beautiful scenery en'route to the temple 
Rankini Temple Near Jaduguda or Jadugora near galudih jharkhand
A small house against the backdrop of hills along the highway
A small house against the backdrop of hills along the highway
Scenic beauty along the highway near Rankini Temple
The temple is only about 30 KMs away from steel city of Jamshedpur and 12 kilometers from Galudih on the Howah Tatanagar railway. This place can easily be covered in a day trip from both these places. Public transport is scarce so you need to hire a car if you are coming from Jamshedpur. From Galudih you will get autorickshaws as well.

There is no place to eat near the temple. You need to visit nearest town Jaduguda for eateries. Choice will be limited though.

Sunday, February 19, 2017

PICE HOTELS OF KOLKATA - HOTEL TARUN NIKETAN তরুণ নিকেতন

HOTEL TARUN NIKETAN-A TRADITION OF OVER HUNDRED YEARS

Hotel Tarun Niketan Pise Hotel Kolkata


এযাবৎ উত্তর এবং মধ্য কোলকাতার অনেকগুলিই অতিবিখ্যাত, অল্পবিখ্যাত এবং অবিখ্যাত পাইস হোটেলেই খাওয়ার সুযোগ হয়ে গেছে।তেমন কিছু কিছু অভিজ্ঞতার কথা আগে লিখেওছিসিদ্ধেশ্বরী আশ্রম, জগন্মাতা হোটেল, জগন্নাথ হোটেল, স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল, এগুলি কোলকাতার পাইস হোটেলের জগতে এক একটি নক্ষত্র। বহু পুরনো ঐতিহ্যবাহি এই প্রতিষ্ঠানগুলি সব ঝড় ঝাপ্টা সামলে, শতবর্ষ পার করে আজও সমানতালে চলছে।যদিও অনেক পাইস হোটেলই আবার ঝাঁপ ফেলেছে যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে, তবু পুরনো কোলকাতার ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির একটা টুকরো এখনও বেঁচে আছে এই কটি পাইস হোটেলের মধ্যে দিয়ে।তবে আর কদিন থাকবে সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন আছেই, সব কিছুই বড় তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই জিনিস বেঁচে থাকবে কিনা বা তারাও আর এতে উৎসাহ দেখাবে কিনা তা হয়ত শুধু সময়ই বলতে পারবে।

আমার এক ধরনের নেশা লেগে গেছে। খুঁজে খুঁজে যাই এই ধরনের হোটেল গুলোতে। কারণ মূলতঃ দুটি। প্রথমত তো আমি মার্কামারা ভেতো বাঙ্গালী, সেজন্য পাইস হোটেলের ভালো এবং নিখাদ বাঙ্গালী রান্নার স্বাদের একটা অমোঘ টান তো আছেই। দ্বিতীয় কারণ এই হোটেলগুলোর গায়ে এখনও এক বিগত যুগের অদ্ভুত মন উদাস করা গন্ধ লেগে আছে। প্রাচীন বাড়ির মলিন বিবর্ণ ইঁটের মোটা দেওয়াল, কড়ি বরগার ছাদে ক্লান্ত ফ্যানের ঘুর্নণ, শ্বেতপাথরের টপ দেওয়া কাঠের টেবিল আর চেয়ার, ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা দিনের মেনু, কলাপাতায় ভাত, নুন লেবু আর কখন বা মাটির ভাঁড়ে জল, অচেনা মানুষদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষী করে বসে খাওয়া, কর্মচারীদের নামতা পড়ার মতো সুরে মেনু আওড়ানো, সবমিলিয়ে মনে হয় সময় যেন এই হোটেলগুলোর চার দেওয়ালের মধ্যে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেবাইরের ঝাঁ চকচকে আধুনিক কোলকাতা ছাড়িয়ে এখানের চৌকাঠ পেরোলেই হঠাৎ করে এক অন্য জগতে ঢুকে পড়া, যেন টাইম মেশিনে চেপে হুশ করে বেশ কয়েক দশক পিছিয়ে যাওয়া সম্পুর্ণ হারিয়ে যাবার আগে এই সবকিছুরই একএকটা টুকরো ধরে রাখার চেষ্টা আমার অক্ষম কলম আর ক্যামেরায়।

স্বভাবতই পাইস হোটেলের রমরমা উত্তর আর মধ্য কলকাতাতেই বেশী। বহু প্রাচীন অঞ্চল এইসব। সেই সুদুর বৃটিশ আমল থেকে যবে থেকে কোলকাতা ব্যাবসা বানিজ্যে কল্লোলিনী হতে শুরু করেছে সেইসময় থেকেই শুরু হয়েছে রুটিরুজির খাতিরে দেশীয় মানুষের ঢল। আর এই মানুষগুলিকে সন্তায় খাওয়ানোর জন্য কালের নিয়মে আস্তে আস্তে গোড়াপত্তন হয় পাইস হোটেল কালচারের। এবং শুধু সস্তা নয় এমন স্বাদের ঘরোয়া খাওয়া যা তাঁদের বাড়ির রান্না না পাওয়ার দুঃখ কিছুটা হলেও তো ভোলাবেই। আর একটা অবশ্য শর্ত আছে সব পাইস হোটেলেরই, সব রান্নাই হতে হবে অতি হালকা আর সহজপাচ্য। রোজকার খাওয়া যাতে পেটরোগা বাঙ্গালীর অম্লশুলের কারণ না হয়।

দক্ষিণ কোলকাতা বয়সে নবীন, স্বাধীনতার পর থেকেই মুলতঃ এই সব অঞ্চলে বসতির ঘনত্ব বেড়েছেসেযুগে ব্যাবসা বানিজ্যর ভরকেন্দ্র কোনকালেই এদিকে ছিল না, সেজন্য পাইস হোটেলের পত্তনও বিশেষ হয় নি। কিন্তু উত্তরের মতো না হলেও দক্ষিণ একেবারে বঞ্চিত হয় নি। এ অঞ্চলেও আছে কিছু পাইস হোটেল, এবার বেরোনো তারই খোঁজে।
            
দক্ষিণ কোলকাতায় পাইস হোটেল খুঁজলে প্রথমেই যে নামটি আসবে সেটা তরুণ নিকেতন রাসবিহারী মোড় থেকে ডান দিকের ফুটপাথ ধরে গড়ি্যাহাটের দিকে পঞ্চাশ মিটার মতো এগোলেই পাওয়া যাবেফুটপাথের ভিড়ভাড়াক্কা, অসংখ্য হকারের জড়াজড়িতে গেটটা ঠাহর করা একটু মুশকিলই বটে।একটু খেয়াল রাখলেই নজরে পড়বে সরু এনট্রান্স, উপরে অবশ্য বোর্ডে নাম লেখা আছে। গেট থেকে সরু গলি ধরে এগোলেই হোটেল।

Hotel Tarun Niketan kolkata Entrance

Hotel Tarun Niketan Kolkata Main Entrance

ভিতরে একটা হলঘর মতো, মাঝখানে পার্টিশান করা, দুপাশে কাঠের চেয়ার আর মার্বেল টপের টেবিল পাতা। ঢুকেই ডানদিকে ছোট কাঠের ক্যাশ কাউন্টার। হলঘরের পিছনের দিকে হেঁশেল। 
Hotel Tarun Niketan Interior View

Hotel Tarun Niketan Kolkata Interior

সামনেই ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা মেনু আর মুল্য তালিকা ঝুলছে। ব্ল্যাকবোর্ডেটিতে একবার চোখ আটকাতে বাধ্য। এই হোটেলের যেটা আসল বৈশিষ্ট্য, মানে অন্য কোন পাইস হোটেলে যেটা আমি অন্ততঃ কখনো দেখিনি সেটা এখানে লেখা। পাঠক মেনু বোর্ডের ছবিটা দেখলেই বুঝবেন, এখানের বেশির ভাগ রান্নাতেই পেঁয়াজ রসুন পড়ে না। ব্যাতিক্রম শুধু বিশেষ কিছু মাছের আইটেম আর মাংস।আর মজার ব্যাপার মুল্য তালিকায় আছে কলাপাতা আর মাটির ভাঁড়। এর দামও আলাদা ভাবে ধরা। পাইস হোটেলের ঘরানা মেনেই এখানে মাছের পদের ছড়াছড়ি। প্রতিদিন অন্ততঃ আট দশ রকম মাছের পদ তৈরী হয়।রুই কাতলা থেকে ইলিশ, পার্শে, ট্যাংরা, পাবদা, বোয়াল, আড়, বাটা, কই সবই পাওয়া যায়। পাঁঠা মুরগীর মাংস মায় ডিমের কারী, সেতো আছেই। 
Hotel Tarun Niketan Kolkata Menu Board


Hotel Tarun Niketan Menu Board

ঝটপট সার্ভিস, কলাপাতায় ভাত, সঙ্গে ডাল, কড়া করে বানানো আলুভাজা, ফুলকপির ডালনা। বাটি করে করে এলো সব পদ। আমরা নিয়েছিলাম বোয়াল মাছ, আড় মাছ, ট্যাংরা মাছ আর পাঁঠার মাংস। 
Hotel Tarun Niketan Bengali Food

Hotel Tarun Niketan Bengali Food

ডালটার এতো ভালো স্বাদ তাই দিয়েই অনেকটা ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম। ফুলকপির ডালনাটা অতো ভালো লাগে নি, শুকনো আর কপিগুলো একটু শক্ত। বোয়াল আর আড় মাছটা ভালো ছিলো।বড় রিং পিস, ঝোলের স্বাদও ভালো, এগুলো অবশ্য পেঁয়াজ রসুন দিয়েই রান্না। 

Hotel Tarun Niketan Bengali Spread

Hotel Tarun Niketan Aar Fish

কিন্তু অসামান্য ছিলো ট্যাংরা মাছের ঝোল। বাটিতে দুপিস মাঝারি সাইজের দেশী ট্যাংরা মাছ, এটা পেঁয়াজ রসুন বিহীন, শুধু সিম, আলু আর বড়ি দিয়ে হালকা করে ঝোল।কাঁচালঙ্কার একটা হাল্কা ঝাঁঝ আছে। এককথায় অমৃত।

Hotel Tarun Niketan - Tyangra Fish

এখানে একটা মজার জিনিস দেখলাম, এখানে আলুর খুব কদর, সব মাছ বা মাংসের পদেই অনেকটা সেই সর্বঘটে কাঁঠালী কলার মতো হাজির একপিস করে বেশ বড় সাইজের আলু। এমনিতে মন্দ নয় ব্যাপারটা, তবে আমরা যেভাবে অর্ডার করেছিলাম, মানে শুধু তিন চার রকম মাছেরই পদ এবং তারপর মাংস, তাদের সবার সঙ্গে একটি করে আলু খেতে গেলে পেটেই আলুর ক্ষেত হওয়া অসম্ভব নয়।     

পাঁঠার মাংসের কথায় আসি। প্রথমেই বলে রাখি যাঁরা কষা মাংসের ভক্ত বা আশা করেন বেশ কষা গোছের খুনখারাপি লাল রঙের ঝোল হবে তাঁরা বেবাক নিরাশ হবেন। এখানে একেবারে ঘরোয়া মাংসের ঝোল, মানে বাঙ্গালীর বাড়িতে রোববার দুপুরে যা হয় আর কি। পাতলা লাল রঙের ঝোল, ওপরে সোনালী রঙের তেলের একটা হাল্কা আস্তরণ ভাসছে। দুপিস মাংস আর সঙ্গে অবশ্যই একটি বড় আলু।দেখেই মনটা কিরকম তা ধিন তা ধিন করে ওঠে। ঝাল বেশী নেই, মানে অত্যন্ত মার্জিত, নাকের জলে চোখের জলে হবার সিন নেই। তবে কাঠ বাঙ্গাল জিভে ধরতাই নাও লাগতে পারে, ঘটিরা বেশী মানিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ জিনিষ তৈরীই করা রোজের খাওয়ার কথা ভেবে। যা সপ্তাহে সাত দিন খেলেও পেট জবাব দেবে না। আর একটা ব্যাপার, আমার কাছে যে কোন ভালো পাঁঠার মাংসের পদের যেটা প্রাথমিক শর্ত, মাংস একেবারে নরম হতে হবে। শক্ত থাকবে না,যাতে রাবারের মতো দাঁত খিঁচিয়ে টানাটানি করতে হয়, আবার এমন নয় যে গলে পাঁক হয়ে যাবে।এই ব্যালান্সটাই আসল, রাঁধুনীর কেরামতি, মানে একদম নিখুঁত ম্যারিনেশান এবং সেদ্ধ হওয়া যাতে প্লাস্টিকের চামচ দিয়ে কেটে খাওয়া যেতে পারে। এব্যাপারে এখানের মাংস একেবারে দশে দশ, এক্কেবারে মাখন।  

Hotel Tarun Niketan Mutton Dish


দুজনা মিলে ভরপেট খেয়ে, ঢেঁকুর তুলে (হ্যাঁ পাইস হোটেলে আপনার ইমোশানকে দাবিয়ে রাখার দরকার নেই, টেবিল ম্যানার্স নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না। সশব্দে ঢেঁকুর তোলাকে এখানে কেউ বাঁকা চোখে দেখবে না)মৌরি চিবিয়ে দেখলাম সব মিলিয়ে বিল দাঁড়িয়েছে চারশ নব্বই টাকা(কলাপাতার দাম সহ)।আমরা বক রাক্ষসের মতো খেয়েছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিল একটু উপর দিকে। তবে সাধারণ ভাবে ১৫০ – ১৮০ টাকায় পেটচুক্তি খাওয়া নেমে যাবে। মাংসের প্লেট ১০০ টাকা করে, মাছের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে, সুতরাং পকেটে সে হিসেবে বিশেষ চাপ পড়বে না।আর হ্যাঁ এখানে ওনলি ক্যাশ, নো প্লাস্টিক।

খেতে ঢুকে ব্ল্যাক বোর্ডে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন সেদিনের মেনুর ডিটেলের জন্য। যেরকম যেরকম পদ শেষ হচ্ছে ব্ল্যাক বোর্ড থেকে মুছে যাচ্ছে সাথে সাথে, এক্কেবারে রিয়েল টাইম ইনফরমেশান। যাঁরা খাবার দিচ্ছেন তাঁদেরও জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ঝড়ের বেগে তাঁরা মেনুর ফিরিস্তি দিয়ে যাবেন। আপনি দেখেশুনে ফাইনাল অর্ডার দিয়ে দিলে তিনি টেবিল নম্বর সহ হুড়হুড় করে অনেকটা শুভঙ্করী নামতা আওড়ানোর স্টাইলে সব অর্ডার আইটেম আর তার দাম একটানে বলে যাবেন আর কাউন্টারের ভদ্রলোক অসম্ভব দক্ষতায়, শর্টহ্যান্ডকেও হার মানিয়ে একই গতিতে সেটা একটা খোপ কাটা পাতায় নোট করে নেবেন। আপনার কাজ হবে খাওয়ার শেষে কাউন্টারে গিয়ে শুধু আপনার টেবিল নম্বরটা বলা। সব টেবিলের গায়েই নম্বর লেখা আছে। সেটা শুনেই কাউন্টারের ভদ্রলোক আপনাকে টোটাল অ্যামাউন্টটা বলে দেবেন, আর আপনি দাম মেটাবেনএই ব্যাপারটা বেশ মজা লাগলো আমার। খেতে খেতে মাঝে মাঝেই কানে আসছে সেই নামতা, আশেপাশের টেবিলে অর্ডার হলেই। নব্বইয়ের দশকে অঞ্জন দত্তর একটা জনপ্রিয় গান ছিলো, যার একটা লাইন বোধহয় এরকম “শুনতে কি চাও তুমি সেই অদ্ভুত বেসুরো সুর, ফিরে পেতে চাও কি সেই আনচান করা দুপুর" অনেকটা সেই কেস। এত ইন্টেরেস্টিং শোনাল যে ব্যাপারটার একটা রেকর্ডিংই করে নিলাম।


খাওয়ার পর কথা হচ্ছিল কাউন্টারে বসা ভদ্রলোকের সঙ্গে, যিনি বিল লিখছিলেন। সদাশয় মানুষটি হলেন অরুন দেবএটি ওনাদেরই পারিবারিক ব্যাবসা, উনি তৃতীয় প্রজন্ম হোটেলটি সামলাচ্ছেন। 

Hotel Tarun Niketan Arun Deb Owner

তরুণ নিকেতনের যাত্রা শুরু সেই ১৯১৫ সালে ওনার ঠাকুরদা জগৎ চন্দ্র দেবের হাত ধরে। দীর্ঘ চলার পথে খাওয়ারের কোয়ালিটিই এনাদের সবচেয়ে বড় মূলধন। পেঁয়াজ রসুণ ছাড়া রান্নার ব্যাবস্থার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। উনি জানালেন একদম শুরুর দিন থেকেই এই ট্র্যাডিশান চলে আসছে। সেকালের মানুষরা অনেকেই পেঁয়াজ রসুণ খেতেন না, তাঁদের সুবিধার জন্যই হয়ত এই ব্যাবস্থা। অমরনাথ দেব, অরুণবাবুর ছেলে জানিয়েছিলেন যে এককালে হয়ত কোন গুরুদেবের নির্দেশেই হোটেলের রান্নায় পেঁয়াজ রসুন ব্রাত্য হয়েছিলো, তবে এরও কোন প্রামাণ্য তথ্য ওনার কাছে নেই। তবে আর একটা কারণ থাকতে পারে, এটা অবশ্য নিতান্তই আমার নিজস্ব অনুমান, কালীঘাট মন্দির কাছাকাছি হওয়ার জন্য হয়ত তীর্থযাত্রীরাও এখানে আসতেন খেতে, হতে পারে সেযুগে তাঁদের একটা বড় অংশই ছিলেন নিরামিষাশী মানে যাঁরা পেঁয়াজ রসুনও ছুঁতেন না।এঁদের কথা ভেবেও এই ব্যাবস্থা চালু হতে পারে। আমদের আচারে কালীপুজোয় নিরামিষ মাংস প্রসাদ হবার চলন আছে, মানে মুলতঃ বলির পাঁঠার মাংস বিনা পেঁয়াজ রসুনে রান্না করে প্রসাদী মাংস হিসেবে খাওয়া।কালীঘাট শক্তিপীঠ, এর প্রভাব থাকতেও পারে, সঠিক জানা না গেলেও এটা এই হোটেলের একটা নিজস্ব ট্রেডমার্ক বটে।

হোটেল খুলে যায় সকাল নটায়, অত আগে অবশ্য সব কিছু রেডি হয় না। মোটামুটি বেলা বারোটা থেকে ভীড় বাড়তে থাকে। চলে প্রায় তিনটে অবধি। আবার খোলে সন্ধ্যা ৬টায়। সে সময় তড়কা রুটি, এগরোল, মোগলাই, ফ্রায়েডরাইস, চাউমিনও বিক্রি হয়। ঝাঁপ পড়ে রাত সাড়ে দশটায়।

Hotel Tarun Niketan Snacks Menu Board

হোটেল সপ্তাহের প্রতিদিনই খোলা. বছরে একটি দিন মাত্র বন্ধ থাকে, সেটি হলো দোলের দিন। সেজন্যে যেতে পারেন যে কোনো দিনই। দুপুরে গেলে ভিড় এড়ানোর জন্য একটু আগে পৌঁছনই ভালো।ঠিকানা রইলো নিচে। আমি গুগল ম্যাপে আপডেট করে দিয়েছি, যেখান থেকেই যান, ফোনে ডেস্টিনেশান সেট করলেই গুগলবাবা পৌঁছে দেবে।

হোটেল তরুণ নিকেতন।                     Hotel Tarun Niketan

৮৮/১বি, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ,              88/1B, Rashbehari Avenue
কালীঘাট মেট্রো স্টেশানের কাছে            Near Kalighat Metro Station
কোলকাতা – ৭০০ ০২৬।              Kolkata – 700 026

এই ব্লগটির সব ফোটো এবং ভিডিও তুলেছেন আমার বন্ধু এবং কোলকাতার একজন অগ্রনী ভ্রমণ লেখক ও ফোটোগ্রাফার অমিতাভ গুপ্ত। ঋণস্বীকার তাঁর কাছে।